বিশ্বব্যাংক পদ্মা সেতু প্রকল্পে ঋণ সহায়তা না দেয়ায় সরকার সাময়িক বিপাকে পড়লেও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দৃঢ় নেতৃত্বে সড়ক ও রেললাইন সম্বলিত দ্বিতল সেতু বাস্তব হয়েছে। এই সেতু শুধু যোগাযোগ, কৃষি অর্থনীতি ও দেশজ উৎপাদনে ইতিবাচক প্রভাব বয়ে আনায়নের পাশাপাশি দক্ষিণ বাংলার প্রত্ন-জাতিতাত্বিক ও সংস্কৃতির সঙ্গে মেলবন্ধন ঘটাবে।
বুধবার (৭ ডিসেম্বর) বিকালে জাতীয় জাদুঘর জাদুঘরের কবি সুফিয়া কামাল মিলনায়তনে ‘পূর্বাপরে পদ্মা সেতু: সাংস্কৃতিক পরিপ্রেক্ষিত’ শীর্ষক সেমিনার ও আলোচনা সভায় বক্তাদের বক্তব্যে এমন কথা উঠে আসে।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদ। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন প্রাবন্ধিক ও গবেষক জনাব খান মাহবুব। আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এম হাবিবুর রহমান। স্বাগত বক্তব্য দেন জাতীয় জাদুঘরের মহাপরিচালক মো. কামরুজ্জামান। সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর পর্ষদের সভাপতি অধ্যাপক আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক।
স্বাগত বক্তব্যে কামরুজ্জামান বলেন, প্রমত্তা পদ্মা নদীর ওপর নির্মিত বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় অবকাঠামোর নাম পদ্মা বহুমুখী সেতু। বহুল প্রতীক্ষিত স্বপ্নের পদ্মা সেতুটি মুন্সীগঞ্জ জেলার মাওয়া থেকে শরীয়তপুর জেলার জাজিরা পর্যন্ত সংযুক্ত। এই সেতুটি শুধুমাত্র একটি সেতু নয়, এটা আমাদের অহংকার। দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলের মানুষের আশা, মানুষের স্বপ্ন।
মূল প্রবন্ধে খান মাহবুব বলেন, বাংলাদেশের নদীকেন্দ্রিক আখ্যানের সবচেয়ে বড় পটভূমি পদ্মা। বাঙালির লোকসংস্কৃতি স্বর্গমত্য, পাতাল, অন্তরীক্ষ পর্যন্ত গল্পের পটভূমি বিস্তৃত। পদ্মা নদীর উপর সেতু নির্মাণ শুধু আন্তঃনদী সংযোগ নয়। আর্থসামাজিক পরিপ্রেক্ষিতে এক রূপদানের বড় বিষয়। এখন অনায়াসে পর্যটকরা ছুটবেন সুন্দরবন, কুয়াকাটা, ষাট গম্বুজ মসজিদ, বিজয়গুপ্তের মনসা মন্দিরে, কুড়িয়ানা-ভীমরুলির পেয়ারা আমড়া বিক্রির ‘জলের হাট বাজারে’, উজিরপুরের শাপলার বিলে, ধানসিঁড়ি নদীতে কিংবা পায়রাবন্দরসহ নানা স্থানে। পদ্মার পতিত চরাঞ্চলে গড়ে উঠবে নতুন বসতি। নতুন জনপদে যাপিত জীবনের নানা অনুসঙ্গে ঘটবে সংস্কৃতির মিথস্ক্রিয়া।
আলোচনায় অধ্যাপক এম হাবিবুর রহমান বলেন, সাংস্কৃতিক অঙ্গনে নদীর ভূমিকা অপরিসীম। নদী আমাদের শিক্ষা, সংস্কৃতি ও অর্থনীতিকে প্রসারিত করে। একটি সেতু শুধু একটি সেতু না, মূলত নদীর দুই পারের মানুষের মধ্যে সেতু বন্ধন তৈরি করে। পদ্মা বহুমুখী সেতুর মাধ্যমে শিল্পায়ন ও বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ড প্রসারের লক্ষ্যে পুঁজির প্রবাহ বাড়বে, পাশাপাশি স্থানীয় জনগনের জন্য অর্থনৈতিক ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। এছাড়াও স্থানীয় জনগণ উন্নততর স্বাস্থ্য সেবা, শিক্ষা ও প্রশিক্ষনের জন্য খুব সহজেই রাজধানী ঢাকা যেতে পারবেন। সেতু নির্মাণের ফলে নদীর তীর সংরক্ষণের ফলে নদীভাঙন ও ভূমিক্ষয় কমবে। সার্বিক বৈপ্লবিক পরিবর্তনে পদ্মা সেতু গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে কে এম খালিদ বলেন, বাংলাদেশের দীর্ঘতম সেতু পদ্মা বহুমুখী সেতু। কোনোরূপ বৈদেশিক সাহায্য ছাড়াই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত তত্ত্বাবধানে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের নিজস্ব অর্থায়নে বাস্তবায়িত সর্ব বৃহৎ প্রকল্প এই পদ্মা সেতু। পদ্মা সেতু বাস্তবায়নের মাধ্যমে দেশের দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ১৯টি জেলা সরাসরি সারা দেশের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। বিপুল সম্ভাবনাময় বহুমুখী উন্নয়নে এই সেতুর অর্থনৈতিক গুরুত্ব অপরিসীম।
সভাপতির বক্তব্যে অধ্যাপক আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক বলেন, বাঙালি চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করতে পারে। পদ্মা সেতু বাস্তবায়ন বাংলাদেশের জন্য বিশাল অর্জন। অনেক প্রতিকূলতাকে জয় করে নির্মিত হয়েছে পদ্মা সেতু। এ সেতুকে ঘিরে গড়ে উঠবে নতুন অর্থনৈতিক অঞ্চল ও হাইটেক পার্ক। ফলে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট হবে এবং দেশের শিল্পায়নের গতি ত্বরান্বিত হবে। সেতু ঘিরে পদ্মার দুপারে পর্যটন শিল্পের ব্যাপক প্রসার এখন শুধু সময়ের অপেক্ষা মাত্র।

