একজন হামাগুড়ি দিয়ে হাটেন অন্যজনের মেরুদন্ডের হাড় নেই, দুজনেই এইচএসসি পরীক্ষার্থী

আরো পড়ুন

যশোর প্রতিনিধি ||
যশোর সদর উপজেলার সিরাজসিংগা গ্রামের আব্দুর সাত্তারের মেয়ে মিনা খাতুন (২০) এবং আব্দুল মজিদ সরদারের মেয়ে তাহমিনা (১৯)। দু’জনেই জন্মগত ভাবে শারীরিক প্রতিবন্ধী। তবুও হার মানেনি শিক্ষা জীবনে। মিনার জন্মগত ভাবে দু’পায়ে সমস্যা এবং তহমিনার মেরুদন্ডের তিনটি হাড় নেই।

দু’জনেই যশোর মুক্তিযোদ্ধা কলেজের মানবিক বিভাগ থেকে এবার এইচএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করছেন। শারীরিক প্রতিবন্ধী হওয়ায় যশোর শিক্ষাবোর্ড কতৃপক্ষ তাদের নির্ধারিত সময়ের থেকে ২০ মিনিট সময় বেশি ধার্য করেছেন।

রবিবার সকালে পরীক্ষা কেন্দ্র যশোর কলেজে সরজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ওই দুই শিক্ষার্থীকে তাদের মা পরীক্ষা হলে নিয়ে এসেছেন। একজনকে কোলে, অন্যজনকে ঘাড়ে ভর করে হাটিয়ে নিয়েসেছেন। ঘন্টা বাজতেই মিনা হামাগুড়ি দিয়ে পরীক্ষার হলে প্রবেশ করেন। অন্যদিকে তহমিনাকেও তার সহপাঠীরা ঘাড়ে ভর করে তার পরীক্ষার আসনে বসিয়ে দেন।

মিনার বাবা পেশায় একজন ডাব বিক্রেতা। ভ্যানে করে ডাব বিক্রি করে মিনার পড়ালেখা এবং সংসারের খরচ চালিয়ে যাচ্ছেন। অপরদিকে তহমিনার বাবা কৃষি কাজ করে তহমিনার পড়ালেখা চালিয়ে যাচ্ছেন। দুজনেরই স্বপ্ন বড় হয়ে তারা মেজিস্ট্রেট বা বিচারক হবেন।

IMG 20221106 101541 294 2

মিনা বলেন, আমি শারীরিক প্রতিবন্ধী, হাটাচলা করতে পারি না। হামাগুড়ি দিয়েই হাঁটাচলা করি। আমি আমার পড়াশোনা চালিয়ে যেতে চাই, আমার ভবিষ্যৎ স্বপ্ন আমি একজন মাজিস্ট্রেট বা বিচারক হতে চাই। আমার কলেজের অধ্যক্ষ আমাদের দুজনকেই অনেক সহোযোগিতা করেছেন। আমাদের বোর্ড ফিস, যাতায়াত খরচ তিনিই বহন করছেন।’

অপরদিকে তহমিনা বলেন, ‘আমার মাজায় মেরুদণ্ডের তিনটি হাড় নেই। তবুও আমি আমার পড়ালেখার জীবনে হার মানতে চাই না। আমি আমার পড়াশোনা চালিয়ে যেতে চাই এবং আমাদের দুজনের স্বপ্নই মেজিস্ট্রেট বা বিচারক হওয়ার।’

এদিকে মিনা ও তহমিনার অভিভাবকেরাও স্বপ্ন দেখছেন তাদের প্রতিবন্ধী মেয়েরা পড়ালেখা করে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে তাদের স্বপ্নকে বাস্তবে রুপ দেবেন। এজন্য তাদের দুই পরিবারের সদস্য এবং শিক্ষকেরাও তাদের জন্য অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন।

IMG 20221106 101352 2

মিনার মা আছিয়া খাতুন বলেন, আমার মেয়ে শারীরিক প্রতিবন্ধী। আমার স্বামী একজন ডাব বিক্রেতা। আমরা স্বামী- স্ত্রী সংগ্রাম করে আমাদের সন্তানকে এ পর্যন্ত নিয়ে এসেছি। আমরা বিশ্বাস করি আমাদের মেয়ে প্রতিবন্ধী হওয়া সত্বেও একদিন তার স্বপ্নের দার প্রান্তে পৌছাবে। এজন্য আমি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সহ সকলের সহোযোগিতা কামনা করছি।’

তহমিনার মা রেখা পারভিন বলেন, ‘আমার মেয়ের মাজায় হাড় নেই। তিনবার অপারেশন করিয়ে এখন মোটামুটি ও দাড়াতে পারে। আমরা পরিবার সদস্যরা এবং শিক্ষকেরা সকলে আশাবাদী তারা দুইজনই ভালো ফলাফল করবে।’

যশোর মুক্তিযোদ্ধা কলেজের অধ্যক্ষ ড. গৌর চন্দ্র মিস্ত্রী বলেন, মিনা ও তহমিনা আমার কলেজের ছাত্রী। তারা দুজনেই অনেক মেধাবী। আমি তাদের সর্বত্বক সহোযোগিতা করে এসেছি। আমার দৃঢ় বিশ্বাস এবারও তারা ভালো ফলাফল করবে। এবং তাদের যে স্বপ্ন, সে স্বপ্ন তারা একদিন বাস্তবায়ন করবে। এজন্য আমি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নিকট আবেদন জানাই তাদের দিকে সহোযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয়ার জন্য।’

পরিক্ষা কেন্দ্রে দুই প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীকে আলাদা কক্ষে বসিয়ে অতিরিক্ত ২০ মিনিট সময়সহ বোর্ড কর্তৃক সকল সুযোগ সুবিধা দেয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন পরীক্ষা কেন্দ্র যশোর কলেজের অধ্যক্ষ মোস্তাক হোসেন শিম্বা। তিনি বলেন, এ দুই প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীর জন্য শিক্ষা বোর্ড অতিরিক্ত ২০ মিনিট সময় বেশি ধার্য করেছে। সে মোতাবেক তাদের বোর্ডের নির্দেশনা অনুযায়ী তাদের পরীক্ষা কেন্দ্রে সুযোগ সুবিধা দেয়া হচ্ছে তারা যেন সুষ্ঠু সুন্দর ভাবে পরীক্ষা দিতে পারে।’

IMG 20221106 105452 542 2

প্রতিবন্ধী দুই সহপাঠী মিনা ও তহমিনা সংগ্রামের পথ জয় করে তাদের স্বপ্নের দারপ্রান্তে পৌছাবে এমনটাই প্রত্যাশা সকলের।

জাগো/আরএইচএম

আরো পড়ুন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

সর্বশেষ