‘যশোরের যশ-খেজুরের রস’- এটি কয়েকবছর আগেই বাস্তব হলেও এখন সেটি প্রায় বিলুপ্ত হতে চলেছে। কমে যাচ্ছে খেজুর গাছ। কমেছে রসের উৎপাদনও। এক সময় যশোরের খেজুরের গুড়ের চিনির খুব নামডাক ছিল।
বর্তমানে আখের চিনিতে বাজার সয়লাব হওয়ায় খেজুরের গাছ কেটে ফেলে আবাদী জমি তৈরি করছে কৃষক। ফলে হুমকির মুখে যশোরের খেজুর রস-গুড়ে ঐতিহ্য।
জানাযায়, ১৮৬১ সালে যশোরের চৌগাছার তাহেরপুরে কপোতাক্ষ নদের পাড়ে ইংল্যান্ডের মিঃ নিউ হাউস কারখানা স্থাপন করে যান্ত্রিক পদ্ধতিতে ব্রাউন সুগার উৎপাদন করে বিপ্লব ঘটাতে সক্ষম হন। তাহেরপুর স্থানটি মিঃ নিউ হাউসের পছন্দ হবার কারণ ছিল নৌপথে যাতায়াত সুবিধার জন্য। কপোতাক্ষ আর ভৈরবের সংযোগস্থল হওয়ায় উত্তর ও দক্ষিণে সহজে যাতাযাত করা যেত। তখন কপোতাক্ষ নদ ছিল প্রমত্তা। ভৈরবও ছিল নাব্য নদ। তাহেরপুর চিনি কারখানা স্থাপনের পর সেখানে বড় বাজারও বসে। স্থাপিত হয় চিনি কারখানার ইংরেজ কর্মীদের আবাসস্থল। তাহেরপুরে কপোতাক্ষ নদের ঘাটে এসে ভিড় করত দেশী-বিদেশী জাহাজ। মূলত একটি বাণিজ্যিক নগর হিসাবে গড়ে ওঠে তাহেরপুর। ১৮৮০ সাল পর্যন্ত মিঃ নিউ হাউসের ব্রাউন সুগার কারখানাটি চলে। পরে তিনি কারখানাটি বিক্রি করে স্বদেশে ফিরে যান। কারখানাটি ক্রয় করে ইংল্যান্ডের ‘এমেট এ্যান্ড চেম্বার্স কোম্পানি’। তারাও নানা কারণে ১৮৮৪ সালে বিক্রি করে দেন বালুচরের জমিদার রায় বাহাদুর ধনপতি সিংহের কাছে। ১৯০৬ সালে তাঁর মৃত্যু হলে তাঁর বংশধররা এটি চালাতে ব্যর্থ হন। এরপর ১৯০৯ সালে কাশিমবাজারের মহারাজ মনীন্দ্র চন্দ্র, নাড়াজোলের রাজ্যবাহাদুর ও কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি সারদাচারণ মিত্রসহ কয়েকজন মিলে কারখানাটি ক্রয় করে নাম দেন ‘তাহেরপুর চিনি কারখানা’। নতুন ব্যবস্থাপনায় বৃটেন, জাপান ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে বিশেষজ্ঞ আনা হয় কারখানাটিতে। ১৯১৫ সালের দিকে এটি বন্ধ ঘোষণা করা হয়। এরপর আর কোনদিন কারখানাটি উৎপাদনের মুখ দেখেনি।

সেভ দ্য ট্র্যাডিশন এন্ড ইনভায়রনমেন্ট (এসটিই) সভাপতি মোহাম্মদ আবু বকর বলেন, ‘কয়েক বছর আগেও মাঠে অনেক খেজুর গাছ ছিল। এলাকায় অনেক গাছি খেজুর গাছ কাটতেন। কিন্তু এখন আর এসব দেখা যায় না। শীতকালে আমাদের গ্রামে পিঠা-পুলির উৎসবমুখর আমেজ থাকতো। খেজুর গাছ ও গাছির অভাবে বর্তমান তরুণ প্রজন্ম সেই আমেজ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। যশোরের এই ঐতিহ্য আজ যাদুঘরে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে।’
তিনি আরো বলেন, খেজুর গাছ কাটা ও রস সংগ্রহে প্রযুক্তি উদ্ভাবন করতে হবে। তাহলে যশোরের ঐতিহ্য রখা করা আরও সহজ হবে।’
সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক মোঃ সাহেব আলী বলেন, দুবাই, কাতার, সৌদি আরবের সরকার রাস্তার সৌন্দর্য বর্ধনের জন্য খেজুর গাছ রোপন করে। তাদের মতো আমরাও রাস্তার সৌন্দর্য বর্ধনের জন্য খেজুরের চারা রোপন করতে পারি। এতে একদিকে যেমন অর্থনীতি সমৃদ্ধি করবে। তেমনি জলবায়ু, প্রাকৃতি দূর্যোগে নিয়ন্ত্রে ভূমিকা রাখাবে।’

কৃষিবিদ ইবাদ আলী বলেন, একসময় যশোরের সর্বত্রই চোখে পড়ত ঐতিহ্যবাহী খেজুর গাছ। আর খেজুরের রস ও তা দিয়ে তৈরি গুড় পাটালি ছিল এ অঞ্চলের বিখ্যাত একটি সুস্বাদু খাবার। কালের বির্বতনে হারিয়ে যেতে বসেছে। খেজুর গাছের মূল্য কম এবং তা সহজলভ্য হওয়ায় ইটভাটা ও টালি ভাটার মালিকদের টার্গেটে পরিণত হয়েছে। এতে হুমকের মুখে খেজুর গাছ।’
জানতে চাইলে যশোর অঞ্চলের বন সংরক্ষক এএসএম জহির উদ্দিন আকন বলেন, যশোর বন বিভাগের নিজস্ব কোন জমি না থাকায় কি পরিমানে খেজুর গাছ আসে তা কখন জরিপ করা হয়নি। ’
জাগো/আরএইচএম

