নিজস্ব প্রতিবেদক।। যশোরের চৌগাছায় মাদকের আগ্রাসন যেন ধীরে ধীরে ভয়াবহ রূপ ধারণ করতে শুরু করেছে। সীমান্ত জুড়ে গড়ে উঠেছে এক শক্তিশালী মাদক চক্র। মাদকের মূল হোতারা যেন হাতের নাগালের বাইরে। প্রতিনিয়ত নতুন নতুন কৌশল অবলম্বন করছে তারা। মাদকের ফাঁদে পা দিয়ে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীসহ উঠতি বয়সী তরুণরাও স্বাভাবিক জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলছে।
এমন মাদকের বিস্তার আগে কখনো দেখেনি বলে মন্তব্য করেছেন একাধিক স্থানীয়।
অনুসন্ধানে জানা যায়, যশোর জেলা শহরে মাদকের চালান যায় সবচেয়ে বেশি চৌগাছার সীমান্তবর্তী রূট থেকে। চৌগাছা বাজারে মাদক বিকিকিনি দৃশ্যমান না হলেও অলিগলিতে ফেনসিডিলের খালি বোতল পড়ে থাকতে দেখা যায়। উপজেলার ১৬৭ গ্রামের ৩’শত ৫০ জনের অধিক এই কারবারীর সাথে জড়িত। এছাড়াও প্রায় ১০ জনের অধিক প্রতিনিধির বিরুদ্ধে রয়েছে মাদক কারবারের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত থাকার অভিযোগ। পিছিয়ে নেই নারীরাও, উপজেলা জুড়ে ৫০ জনের অধিক নারী মাদক ব্যবসার সাথে জড়িত বলে জানায় একাধিক সূত্র।
আরো জানা যায়, উপজেলার বিশেষ করে তিলেকপুর, লক্ষীপুর, ইন্দেরপুর, হিজলী, আশ্বীনেপুকরে, গয়ড়া, নাইড়া, দিঘড়ী, দিঘলসিংহা, ঢেঁকিপোঁতা, মনমথপুর,কাবিলপুর, মাশিলা, টেঙ্গুরপুর, আন্দুলিয়া, শাহাজাদপুর, আজমতপুর, বল্লভপুর, পুড়াপাড়া, রামকৃষ্ণপুর, ফাঁসতলা, বড়খানপুর, বুন্দলীতলা, দৌলতপুর, সলুয়া, নিমতলা, চান্দা আফরার মোড়, কয়ারপাড়া, লস্কারপুর,
পুড়াপাড়া, মশিউরনগর মোড় এলাকাসহ পৌর সদরের চাঁনপুর, মনমথপুর, বাবুঘাট পাড়া, বেলেমাঠ, পাচনামনা, মাঠপাড়াই মাদকের বিস্তার বেশি। এসব এলাকায় প্রতিনিয়ত প্রকাশ্যেই মাদক বিক্রি হচ্ছে।
আরো জানা যায়, দিনে কোটি টাকার মাদক আমদানী করে চলেছে এসকল চোরাচালানকারীরা। উপজেলার সীমান্তবর্তী অঞ্চল কাবিলপুর, শাহজাদপুর, ঢেঁকিপোতা, মাশিলা, লক্ষীপুর, গদাধারপুর, নায়ড়া, গয়ড়া, তিলেকপুর, আড়শিংড়েপুকরে, দৌলতপুর, আন্দুলিয়ায় গড়ে উঠেছে শক্তিশালী মাদক সিন্ডিকেট।
ভারত থেকে এসকল মাদক চৌগাছা হয়ে ছড়িয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্তে। যার কারণে ঝুকির মুখে শিক্ষার্থী ও যুব সমাজ। উপজেলার সীমান্তে ইন্দেরপুর ও দৌলতপুর হয়ে মাদকের কোটি কোটি টাকার চালান আসছে প্রতিদিন। মাদক চালানের মূলহোতা ইন্দেরপুরের জহু ও ভট্ট, মাকাপুরের রফিকুল, দিঘড়ীর নিজাম, চুটারহুদার আশরাফুল, পুড়াপাড়ার মুন্সি ও বল্লভপুরের মোবারক ও রায়হান মাদক ছড়িয়ে দিচ্ছে উপজেলাসহ বাইরের জেলাগুলোতে।
বড় বড় হোতা থেকে ছড়িয়ে যাচ্ছে উপজেলার বিভিন্ন মাদক ব্যবসায়ীর নিকট। এসব মাদক বিভিন্ন এলাকায় পৌছে দিতে ব্যবহার হচ্ছে দরিদ্র পরিবারের সদস্য, স্কুল শিক্ষার্থী ও উঠতি বয়সের যুবকদের। মাদক কারবারীদের জন হিসাবে কাজে নিতে মূল লক্ষ্য অস্বচ্ছ পরিবারের সদস্য, দরিদ্র পরিবারের নারী ও উঠতি বয়সের তরুণ। জানা গেছে, সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে তরুণেরা
স্কুলের শার্ট, প্যান্ট ও ব্যাগ ব্যবহার করে মাদক পৌছিয়ে দিচ্ছে উপজেলা ও জেলা শহরগুলোতে। ছদ্মবেশে পৌছিয়ে দিতে ফেন্সিডিলের বোতল প্রতি মিলছে ৮০ থেকে ১০০ টাকা।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ইন্দেরপুর থেকে ভ‚ট্ট ও জহুর মাধ্যমে মাদক চালান মনমথপুরের শামীমের নিকট এসে পৌছায়। শামীমের মাদক কেনাবেচার স্থায়ীয় ঠিকানা ঐ গ্রামের ভাটা সংলগ্ন কৃষ্ণচূড়া কফি হাউজ এবং তিনি পাইকারী ভাবে মাদক সরবারহ করেন মনমথপুর গ্রামের আরিফ, মইফুল, চানপুরের মারুফ, রফিকুল ও আক্তার, হুদাপাড়ার ফিকির, দিঘলসিংহের আরিফ ও রবি, পৌর এলাকার কালিতলার রং সোহেল, পূর্ব কারিগর পাড়ার তুহিনসহ উপজেলার বিভিন্ন মাদক ব্যবসায়ী নিকট।
দৌলতপুর সীমান্ত থেকে রায়হান ও আশরাফুলের মাদক চালান ছড়িয়ে দিচ্ছে পুড়াপাড়ার অসীম, খোকন, আক্তার, মুক্তার, রেজাউল। খড়িঞ্চা গ্রামের বাবু ও প্রভাসসহ মাকাপুরের নুরুজ্জামানের রয়েছে প্রকাশ্যে রমরমা মাদক ব্যবসা।
আরো জানা যায়, শহর এলাকায় মাদক পৌছানোর নিরাপদ ও সহজ রুট মাশিলা। গ্রামটি বহুমূখী হওয়াই প্রশাসনের চোখ ফাকিঁ দিতে যেন এটাই বিশ্বস্ত রুট মাদক সরবারহে। সন্ধ্যার পর মাশিলার স্কুল মাঠ যেন মাদকের আতুর ঘর। র্যাবের অভিযানে নিহত এক্সেরের সহযোগী বাগডাঙ্গার সেলিমের ঘাটিঁ বর্তমানে মাশিলা গ্রাম। এছাড়াও মাদক চোরাচালানের সাথে যুক্ত গ্রামের সেলিমসহ সুজন হোসেন, চঞ্চল, জাহিদুল ইসলাম, তরিকুর ইসলাম, আলিম, হাবিব, আমিনুর। এছাড়াও মাদক কারবারির সাথে জড়িত তিলেকপুর পশ্চিমপাড়ার মিজানুর রহমান, তরিকুল ইসলাম, রুমজান আলী, লাল্টু, সাহিনা খাতুন, ফাতেমা বেগম ও আন্দুলিয়া গ্রামের আক্তার হোসেন, মোস্তাফিজুর মোস্তাক, সাইফুল ইসলাম, ফারুক বিশ্বাস ও অদুদ বিশ্বাস। লস্কারপুরের জহির হোসেন, দোকানদার আলম, দক্ষিণ কয়ারপাড়ার সাদ্দাম হোসেন, গাজা আতি। এসকল মাদক কারবারিদের বাধা দিলে প্রান নাশের হুমকি দেয় বলে জানায় এলাকাবাসী।
এসকল মাদক কারবারিদের দ্রুত আইনের আওয়তায় তার জোর দাবী জানিয়েছেন সচেতন মহল।
এবিষয়ে চৌগাছা থানার অফিসার ইনচার্জ সাইফুল ইসলাম বলেন, মাদকের সঙ্গে পুলিশের কোনো আপস নেই। মাদক নিয়ন্ত্রনে উপজেলা জুড়ে আমরা প্রতিনিয়ত কাজ করে চলেছি। শুধু অভিযান চালিয়ে, গ্রেফতার করে বা সাজা দিয়ে মাদক নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। তবে জনগণ যদি সহযোগিতা করে, তাহলে মাদক নিয়ন্ত্রণে পুলিশের পক্ষে কাজ করতে সুবিধা হয়।
এবিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বলেন, মাদকের বিষয়ে সর্বদা সক্রিয় রয়েছি। মাসিক আইন-শৃঙ্খলা সভায় বিষয়টি আমি উপস্থাপন করবো এবং মাদক নির্মূলে অতি শীঘ্রই জেলা মাদক নিয়ন্ত্রন অধিদপ্তর ও উপজেলা প্রশাসন উভয়ে যৌথভাবে কাজ শুরু করবো।
জাগো/আরএইচএম

