যশোরের ফেসবুক মেসেঞ্জার, হোয়াটসঅ্যাপে মাধ্যমে মাদক বিক্রি করা হচ্ছে। আর এই সব মাদকপৌছিয়ে দেয়ার কাজে জড়িত শিশুরা। মাদক কারবারিদের সাহায্য-সহযোগিতায় রয়েছে সন্ত্রাসীবাহিনী; বিপথগামী জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের কিছু ব্যক্তি।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, উৎপাদক, আমদানিকারক, ডিলার, সাব ডিলার, পরিবেশক মাধ্যমে চলছে মাদক বিক্রি। তবে মাদক বিক্রি স্পট হিসেবে পরিচত শহরের ষষ্ঠীতলার বুনোপাড়া, পাখিপট্টি, মুজিব সড়ক বাইলেন, রেলগেট পশ্চিমপাড়া, খড়কি
কলাবাগান, রায়পাড়ার কয়লাপট্টি, বারান্দীপাড়ার লিচুতলা, শংকরপুরের টার্মিনাল, চোপদারপাড়া, সন্ন্যাসী দীঘিরপাড়সহ আরও অনেক জায়গা।
জেলা পুলিশের মুখপাত্র ডিবির ওসি রূপন কুমার সরকার বলেছেন, মাদক ও সন্ত্রাস বিরোধী অভিযান চলমান আছে। এরপরও যদি কেউ এই ধরণের অপরাধের সাথে জড়িত থাকে তাহলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
বদলে গেছে বিক্রির ধরণ : স্পটে বিক্রি ছাড়াও অফিস, মার্কেট ও বাসাবাড়িতে হোম ডেলিভারি করা হচ্ছে। এছাড়াও মোবাইল, ফেসবুক মেসেঞ্জার ও হোয়াটসঅ্যাপে অর্ডার করলে ফেনসিডিল, ইয়াবা, গাঁজা ও আইস জাতীয় মাদকদ্রব্য ইজিবাইক, রিকশা ও মোটরসাইকেল করে পৌঁছে দেয়া হচ্ছে মাদক। আর এসব ব্যবসা নিয়ন্ত্রে তৈরি করা হচ্ছে অস্ত্রধারী বাহিনি।
বহন ও বিক্রিতে শিশুরা : যশোর শহরের ষষ্ঠীতলা বুনোপাড়ায় অনেক বাড়িতে চলছে ফেনসিডিল ও ইয়াবার কারবার। মুঠোফোনে আসে ফেনসিডিল ও ইয়াবা। মাদক কারবারি ও সেবীদের কাছে নেশার ট্যাবলেট ইয়াবা এবং ফেনসিডিল নামে পরিচিত। বিকাশের মাধ্যমে টাকা লেনদেন হলেই বাড়ির শিশু, কিশোর ও কিশোরীদের মাধ্যমে মাদকাসক্তদের হাতে পৌঁছে যায় মাদক।
ষষ্ঠীতলা পাড়ার বাসিন্দা বুনো মানিক ও নিশান এই এলাকায় একচেটিয়া ব্যবসা করে। অবাধে মাদক ব্যবসা চালানোর জন্য এলাকায় সন্ত্রাসী তৎপরতাও চালায় এই মাদক কারবারিরা। আধিপত্য বিস্তারের জন্য সঙ্গে অস্ত্রও বহন করে। যাতে কেউ মাদক ব্যবসায় বাধা
দেয়ার সাহস না করে। কয়েক মাস আগে রিভলবার, গুলি ও ইয়াবাসহ আটক হয় নিশান। এরপর ইয়াবাসহ আটক হয় মানিকের স্ত্রী। মানিকও বেশ কয়েক দফায় অস্ত্রসহ আটক হয়েছে। দুই থেকে আড়াই বছর আগে যশোর এমএম কলেজ সংলগ্ন একটি ছাত্রী মেস থেকে অস্ত্রসহ আটক হয় মানিক। ছাড়া পাওয়ার পর তারা মাদক সন্ত্রাসে জড়িয়ে পড়ে।
ষষ্ঠীতলার পাখিপট্টিতে ফেনসিডিল-ইয়াবা : একই এলাকার মৃত হাফিজুর রহমান মরার স্ত্রী রেখা, সাইফুলের স্ত্রী হাসিনা দেদারছে চালিয়ে যাচ্ছে ইয়াবা ও ফেনসিডিলের কারবার । হাফিজুর ও সাইফুল মারা যাওয়ার পর আবার বিয়ে করেন তাদের স্ত্রী রেখা ও হাসি না। রেখা দ্বিতীয় স্বামীকে আনসার সদস্য বলে পরিচয় দেয়। কিন্তু হাসিনার দ্বিতীয় স্বামী রায়হান পেশাদার সন্ত্রাসী। শহরের শংকরপুর আকবরের মোড়ে বিএনপিনেতা বদিউজ্জামান ধোনী হত্যার প্রধান আসামি রায়হান। পুলিশের হাতে আটকের পর জেলহাজতে রয়েছে । তবে একইসাথে হাসিনাকেও পুলিশ হেফাজতে নিয়েছিল। একই পরিবারে রয়েছে রবিউল ইসলাম।
যশোরের ফেনসিডিল তৈরির কারিগর হিসেবে তার বিরুদ্ধে ইতোপূর্বে বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় সংবাদ প্রকাশিত হয়। শুধু ফেনসিডিল তৈরির কারিগরই নয় রবিউল এর আগে চঞ্চল নামে একব্যক্তিকে ছুরিকাঘাতে হত্যাচেষ্টা করে এলাকা ছেড়ে পালিয়েছিল। পরিবারের সবাই মাদক কারবারি মুজিব সড়ক বাইলেনে ইয়াবা বিক্রি হয় দেদারছে। এখানকার একটি পরিবারের সবাই ইয়াবা বিক্রির সাথে জড়িত।
নান্টু ও অনুপ এখানকার মাদক কারবারের মূলহোতা। এই কাজে তাকে সহযোগিতা করে তাদের স্ত্রী ও বাবা-মা।
রেলগেট পশ্চিমপাড়ায় আছে ডিলার ও ভ্রাম্যমাণ কারবারি : আরেক মাদক সম্রাজ্ঞীর নাম ডালিম। অগণিত বিয়ে করেছেন তিনি। তবে এই ব্যবসায় তিনি একাই নন বরং পরিবারের সদস্যদেরও অন্তর্ভুক্ত করেছেন । ছেলে আলামিন, মেয়ে মিতু, ভাই লুতু, মা রিজিয়া ছাড়াও রয়েছে তার আরো কয়েকজন দিনমজুর। কক্সবাজার থেকে লাখ লাখ পিস ইয়াবা এনে যশোরসহ আশপাশ এলাকায় বিক্রি করেন ডালিম। তবে মেয়ে মিতুর স্বামী মানিক সন্ত্রাসী ও মাদক কারবারি হওয়ায় কয়েক বছর আগে পুলিশের সাথে কথিত বন্দুকযুদ্ধে খুন হয়েছিলেন।
সম্প্রতি মিতু আশরাফুল নামে একজনের সাথে স্বামী-স্ত্রী হিসেবে চলাফেরা করছেন। স্থানীয়রা জানিয়েছে তাদের বিয়ে হয়নি। একই এলাকার সেন্টু ও তার স্ত্রী লিপি, ছেলে আসিফসহ আরো কয়েকজন কারবারি রয়েছে। ওই এলাকার রানা একজন বড় মাপের মাদক কারবারি। সাথে পরিবার ও আত্মীয়স্বজনদের নিয়ে গড়ে তুলেছেন ফেনসিডিলের বাজার। তার বোন ফাতেমা ও ভগ্নিপতি টালি বাবু ওই মাদকের বাজার নিয়ন্ত্রণ করে। স্থানীয় শাহারিয়ার হোটেলের পেছনে বাড়ির পাশাপাশি ইজিবাইকে করে বিভিন্ন স্থানে মাদক পৌঁছে দেন তারা।
অস্ত্র ও মাদকে ভাসছে খড়কি কলাবাগান : এমএম কলেজের দক্ষিণে মাদক ও অস্ত্র ব্যবসার কারণে বহুলালোচিত জায়গাটির নাম কলাবাগান। এখানে সাগর ও রমজান ফেনসিডিল, ইয়াবা ও অস্ত্র ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করে। তাদের মা রেখা ও বাবা ফায়েক একই কাজের সাথে জড়িত। মাদক ব্যবসার নিয়ন্ত্রণে তারা এলাকায় সন্ত্রাসী তৎপরতা চালায় বেপরোয়াভাবে। সাগর-রমজানের মা রেখা নিজের আত্মরক্ষায় বোমা নিয়ে ঘুরে বেড়ায়। কলেজ সংলগ্ন এলাকার বেশকিছু দোকানিকে তাদের ইয়াবা ও ফেনসিডিল বেচাবিক্রিতে বাধ্য করে বলে অভিযোগ রয়েছে।
রায়পাড়ায় প্রশাসনের ধরা মাল : রায়পাড়া কয়লাপট্টির সেকেন্দার আলীর ছেলে হোসেন মরা নিজেকে পুলিশ ও র্যাবের কথিত সোর্স পরিচয় দিয়ে থাকে। আর সেই সুযোগে ইয়াবা, ফেনসিডিল ও গাঁজা বেচাবিক্রি করে। আশপাশের কারবারিরা তার বেচাবিক্রি দেখে কিছু বলার আগেই মরা বলেন। এটা প্রশাসনের ধরা মাল। আবার প্রশাসনের নাম করে মাসোহারা ভোলে মরা। যে কারণে প্রশাসনের কোনো অভিযানের বাতাস তার গায়ে লাগেনি। একই এলাকার আম বাবুর ছেলে রশিদ, প্রিন্স, রনি, রানা ও তার মা জোহরার রয়েছে একটি মাদক সিন্ডিকেট। তারা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অসাধু সদস্যদের কাছ থেকে কেনা ফেনসিডিল ও ইয়াবা
বিক্রি করে বলে এলাকায় প্রচার চালায়। এই সিন্ডিকেট সাপ্তাহিক ও মাসিক ভিত্তিতে অন্য কারবারিদের কাছ থেকে টাকা তোলে পুলিশের এক এএসআই’র নামে। যে কারণে তারা প্রকাশ্যে মাদক বিক্রি করলেও ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়।
আলোচিত আরেক ব্যক্তির নাম সোর্স রহিম ওরফে মুরগি রহিম, স্ত্রী দুলারী, স্ত্রীর বোন রানী, ভায়রা রুই, বিয়াইন রওশনারা, মেয়ে সুরাইয়া, জামাই রনি, এলাকার ফেনসি লাবলু ওরফে কালো লাবলু, সোর্স জয়নাল, সোর্স জয়নালের বোন শেফালী, ভাই মোমরেজ, এলাকার নাসরিন, প্রফেসর রশিদসহ রয়েছে ডজনখানেক কারবারি ।
মাদকের নিত্য হাট বারান্দীপাড়া লিচুতলায় : শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ী আবু তালেব কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হওয়ার পর তার মাদক সম্রাজ্যের নিয়ন্ত্রণ নেন ভাতিজা জাকির হোসেন টুটুল । মাদকবিরোধী অভিযানের কারণে মাঝেমধ্যে তিনি গা ঢাকা দিয়ে থাকেন।তবে তার পোষ্য কারবারি ও দিনমজুররা মাদকের হাট বসিয়ে বেচাবিক্রি অব্যাহত রেখেছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
পুলিশের খাতায় শীর্ষ কারবারি যারা : শংকরপুরের শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ী কাজী তারেক সৌদি আরব আছে বলে প্রচার রয়েছে। কিন্তু মাঝেমধ্যে তাকে এলাকায় দেখা যায়। আরো কয়েকজন ভারতে গা ঢাকা দিয়ে আছে বলে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার একাধিক সূত্রে জানা গেছে।
পুলিশের একটি সূত্রে জানা গেছে, ২০১৮ সালের ২৪ মে তালিকাভুক্ত ১৪ মাদক ব্যবসায়ীর নাম প্রকাশ করে পুলিশ। তারা হলেন- চাঁচড়া রায়পাড়ার বেবি খাতুন, রুমা বেগম, শংকরপুর এলাকার তারেক কাজী, চৌগাছার কাবিলপুর গ্রামের শফি মেম্বার, অভয়নগরের বুইকরা গ্রামের কামরুল ও লিপি, বেনাপোল ভবেরবেড় গ্রামের রবিউল ইসলাম, বারোপোতা গ্রামের রিয়াজুল ইসলাম, চৌগাছার ফুলসারা এলাকার আশরাফুল ইসলাম, কাবিলপুর এলাকার ইসরাইল হোসেন নুনু, শার্শার আনোয়ার হোসেন আনা, বাদশা মল্লিক ও জাহাঙ্গীর। ওই সময় এসব মাদক ব্যবসায়ীদের ধরতে ১০ থেকে ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত পুরস্কার ঘোষণাও করা হয়েছিল।

