যৌতুকের জন্য স্ত্রীকে বেধড়ক পেটালেন এএসপি, মামলা

আরো পড়ুন

ফ্ল্যাট কেনার জন্য ৫০ লাখ টাকা যৌতুক চান সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) রুবেল হক। সেই টাকা না পাওয়ায় তিনি স্ত্রী সায়মা সুলতানা সিমির ওপর চালান নির্মম নির্যাতন। অবশ্য সামান্য কারণেই স্ত্রীকে বেধড়ক পেটানো নাকি তার স্বভাব। এর আগেও তার মারধরে আহত হয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন সিমি। তবে এবার তিনি বেঁকে বসেছেন। স্বামীসহ তার পরিবারের চারজনের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন।

ভুক্তভোগী বলছেন, বিয়ের সময়ও ১৯ লাখ টাকা যৌতুক নিয়েছেন রুবেল। তবে যৌতুকই একমাত্র সমস্যা নয়। তার স্বামীর অন্তত পাঁচটি বিয়ের তথ্য পাওয়া গেছে। বর্তমানে তিনি আরেক নারীর সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্কে জড়িত। তাকে বিয়ে করার উদ্দেশ্যে সিমিকে ডিভোর্সের জন্য চাপ দেয়া হচ্ছে। রাজি না হওয়ায় মাঝেমধ্যেই চলছে নির্যাতন।

অভিযুক্ত এএসপি রুবেল টাঙ্গাইলের মহেড়া পুলিশ ট্রেনিং সেন্টারে কমান্ড্যান্টের স্টাফ অফিসার হিসেবে কর্মরত। তার দাবি, নির্যাতনের অভিযোগ সত্য নয়।

সায়মা সুলতানা সিমির অভিযোগ, স্বামীর নির্যাতনের শিকার হয়ে তিনি টাঙ্গাইলের মির্জাপুর থানায় মামলা করতে গেলে ওসি তা নথিভুক্ত করেননি। পরে গত ৬ সেপ্টেম্বর তিনি রুবেলসহ তার পরিবারের চারজনকে আসামি করে টাঙ্গাইল নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে মামলা দায়ের করেন। শুনানি শেষে বিচারক মামলা রেকর্ড করতে থানাকে নির্দেশ দিয়েছেন। একই সঙ্গে চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটকে ঘটনা তদন্ত করে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেন।

মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার তেররশিয়া গ্রামের জারজিস আলী মধুর ছেলে রুবেল। ভুক্তভোগী সায়মা সুলতানা সিমি নওগাঁর ধামইরহাট উপজেলার চকযাদু গ্রামের আফজাল হোসেনের মেয়ে। তিনি ইডেন কলেজ থেকে পড়ালেখা শেষ করেছেন। ২০২১ সালের ৩১ মে তাদের বিয়ে হয়। বিয়ের আগেই রুবেল ও তার পরিবার ২০ লাখ টাকা যৌতুক দাবি করেন। সিমির ভগ্নিপতি ব্যাংকের মাধ্যমে বিয়ের আগেই দুই লাখ টাকা দেন। আর বিয়ের দিন আট লাখ টাকা ও ১২ ভরি স্বর্ণ দেন। সব মিলিয়ে ১৯ লাখ টাকা যৌতুক দিতে বাধ্য হয় সিমির পরিবার। সম্প্রতি রুবেল ৫০ লাখ টাকার দাবিতে নির্দয় নির্যাতন শুরু করেন।

ভুক্তভোগীর অভিযোগ, নারায়ণগঞ্জ থাকার সময় ২০২১ সালের ১৮ আগস্ট তাকে ব্যাপক নির্যাতন করেন রুবেল। আহত সিমি নারায়ণগঞ্জ হাসপাতালে চিকিৎসা নেন। তখন তিনি বিষয়টি নারায়ণগঞ্জের পুলিশ সুপারকে জানান। অভিযোগের বিষয়টি জানতে পেরে তাকে আরো মারধর করা হয়। পরে বিষয়টি ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজিকে জানানো হয়। এ পর্যায়ে রুবেলকে টাঙ্গাইলের মহেড়া পুলিশ ট্রেনিং সেন্টারে বদলি করা হয়। এখানে এসে তিনি আরো হিংস্র হয়ে ওঠেন। প্রায়ই স্ত্রীর ওপর চালান অমানবিক নির্যাতন। গত ১ মে পিটুনিতে আহত হয়ে টাঙ্গাইল পুলিশ হাসপাতালে ভর্তি হন সিমি। চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাকে মেঝেতে ফেলে মারধর করেন রুবেল। এর আগে গত ২৪ নভেম্বর মেরে তার হাত ভেঙে দেন। তখন টাঙ্গাইল পুলিশ সেন্টার ও সদর হাসপাতালে চিকিৎসা নেন সিমি। ২৯ নভেম্বর টাঙ্গাইল এমআই থেকে চিকিৎসা নেন তিনি। গত ২৩ মে রুবেল, তার বাবা-মা ও বোন তাকে বেদম মারধর করেন। একপর্যায়ে শাশুড়ি নাসিমা বেগম তাকে গলা টিপে হত্যার চেষ্টা চালান। নির্যাতন থেকে বাঁচতে পালানোর সময় শ্বশুর জারজিস আলী ও ননদ নাসরিন তাকে ধরে ঘরে এনে আবারো মারধর করেন। এ সময় সেখানকার অন্য পুলিশ কর্মকর্তার বাসার লোকজন দেখে ফেলায় তিনি প্রাণে বেঁচে যান। পরে তিনি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওয়ানস্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে (ওসিসি) ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নেন। হাসপাতাল থেকে সিমি ঢাকায় তার বোনের বাসায় গেলে সেখানে গিয়েও তাকে মারধর করেন রুবেল। সেই সঙ্গে জানিয়ে দেন, তার সঙ্গে থাকতে হলে ৫০ লাখ টাকা যৌতুক দিতে হবে। মহেড়া অফিসার্স কোয়ার্টারে শ্বশুর, শাশুড়ি ও ননদের নির্যাতনে গুরুতর আহত হয়ে সিমি গত ৯ আগস্ট ঢামেক হাসপাতালে চিকিৎসা নেন। এর আগে ৩ জুলাই স্বামীর নির্মম নির্যাতনে গুরুতর আহত হয়ে তিনি জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ নম্বরে কল করেন। তখন মির্জাপুর থানার এসআই মোশারফ হোসেন গিয়ে ঘটনা তদন্ত করেন। এসব ঘটনা তিনি মহেড়া পুলিশ ট্রেনিং সেন্টারের কমান্ড্যান্টকে জানালেও কোনো সুরাহা হয়নি। পরে তিনি মির্জাপুর থানায় মামলা করতে যান।

মামলা না নেয়ার বিষয়ে মির্জাপুর থানার ওসি শেখ আবু সালেহ মাসুদ করিম বলেন, তিনি একটি অভিযোগপত্র নিয়ে এসেছিলেন। ঘটনাটি যেহেতু দাম্পত্য কলহের, তাই বিষয়টি টাঙ্গাইল পুলিশ সুপারকে অবগত করি। আমাকে আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের জন্য বলা হয়েছিল।

সিমি সমকালকে বলেন, রুবেল আমাকে বিয়ে করার আগেও একাধিক বিয়ে করেছে। নারায়ণগঞ্জে থাকার সময়ই সে দুটি বিয়ে করেছে। কাগজপত্র অনুযায়ী ও মৌখিকভাবে তার পাঁচটি বিয়ে হয়েছে। এখন সে আমার সামনেই অন্য মেয়ের সঙ্গে ভিডিও চ্যাটিং করে। বাধা দিতে গেলেই আমাকে মারধর করে। ডিভোর্স দেয়ার জন্য প্রতিদিন নির্যাতন চালানো হচ্ছে। সে বলছে, নিজে থেকে চলে না গেলে আমাকে মেরে ফেলা হবে। যাতে তারা নির্বিঘ্নে বিয়ে করতে পারে। সে দম্ভ করে বলে, আমি পুলিশ অফিসার, আমার কিছুই হবে না। এতকিছুর পরও আমি তার সঙ্গেই সংসার করতে চাই। শুধু নির্যাতন বন্ধের জন্য মামলা করতে বাধ্য হয়েছি।

অভিযুক্ত এএসপি রুবেল হককে তার ব্যক্তিগত মোবাইল ফোন নম্বরে কল করা হলে তিনি সাংবাদিক পরিচয় শুনে বলেন, আপনি ভুল নম্বরে কল করেছেন। আমি রুবেল না। এরপর তার সরকারি ফোন নম্বরে কল করা হলে তিনি বলেন, এসব অভিযোগ সত্য নয়। স্ত্রীর সঙ্গে আমার কোনো ঝামেলা হয়নি।

আরো পড়ুন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

সর্বশেষ