যশোর শিক্ষা বোর্ডে বিজ্ঞানে শিক্ষার্থী কমেছে ২১ শতাংশ, বাড়ছে প্রযুক্তিপ্রেম

আরো পড়ুন

হাতে হাতে মোবাইল। ওয়েব দুনিয়ায় ঘোরাঘুরি চলছেই। শিশু থেকে উড়তি যুবক সবাই যেন প্রযুক্তির মাস্টার। স্কুল কলেজগামী শিক্ষার্থীরা প্রযুক্তির জোয়ারে রীতিমত ভাসছে। অবিশ্বাস্য হলেও এ যুগে প্রযুক্তি প্রেম বাড়লেও কমছে বিজ্ঞান শিক্ষার অনুরাগ।

পরিসংখ্যান বলছে, ২০১৯-২০২১ এ তিন বছরের তুলনামূলক চিত্রে শুধু যশোর শিক্ষা বোর্ডে এসএসসিতে বিজ্ঞানের শিক্ষার্থী কমেছে ২১ শতাংশ।

যশোরের একটি সরকারি কলেজের একাদশ শ্রেণির ছাত্র সাদেকুর রহমান ধ্যানজ্ঞান মোবাইল। মোবাইলে চোখ বুলাতে বুলেই হয় সকালের নাস্তা। কলেজেও মোবাইল সঙ্গী। বন্ধুদের আড্ডার চেয়ে মোবাইলই তার কাছে বেশি ভালো লাগে। চালাতে চালাতে মোবাইলের অনেক কিছুই তার জানা। ই-দুনিয়ার তার হাতের মুঠোয়। এরপরেও বিজ্ঞানের প্রতি তার অনীহার শেষ নেই।

এসএসসিতে বিজ্ঞান বিভাগে পড়লেও এখন সে মানবিকে পড়ে। তার মা শারমিন খাতুন দুঃখ করে বলেন, ‘হায় রে যুগ এল!, ছেলে-মেয়েরা সারা দিন-রাত মোবাইলে ডুবে থাকে। বাবা-মা ডাকলেও তারা শুনতে পায় না। বিজ্ঞানের আবিস্কার মোবাইল নিয়ে দিনের বেশি সময় পার করে। সারারাত মোবাইলে গেম খেলে, ফেসবুক, ইউটিউব, ইন্টারনেট চালায়। তবুও বিজ্ঞান পড়তে চায় না।
সাদিকুরের বন্ধু আবিদও দিনের শুরু থেকে গভীর রাতে ঘুমানোর আগ পর্যন্ত এভাবেই মোবাইলের মধ্যে নিজেকে ডুবিয়ে রাখে।
শুধু সাদেকুর কিংবা আবিদ নয়, তরুণ প্রজন্ম (অধিকাংশ) নিজেদের ডুবিয়ে রেখেছে স্মার্টফোনের মধ্যে। ওটাই যেন তাদের আরেক পৃথিবী। যে পৃথিবীটা তৈরি করেছে বিজ্ঞানকেই তারা অপছন্দ করতে শিখছে।

যশোর শিক্ষাবোর্ডের গত তিন বছরের এসএসসি পরীক্ষার্থীদের পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, বিজ্ঞানের শিক্ষার্থী উদ্বেগজনকহারে কমছে। মাধ্যমিকের ২০১৯ সালে শিক্ষার্থী ছিল ১ লাখ ৮৩ হাজার ৫৮০। এর মধ্যে বিজ্ঞানের শিক্ষার্থী ছিল ৪২ হাজার ৭৮৯। বিজ্ঞান শিক্ষার্থীর হার ২৩ শতাংশ। ২০২০ সালে মাধ্যমিকে পরীক্ষার্থী ছিল ১ লাখ ৮৪ হাজার ৯০৪। তার মধ্যে ৪০হাজার ৩৪৫ বিজ্ঞানের ছাত্র। বিজ্ঞান শিক্ষার্থীর হার কমে হয়েছে ২১ শতাংশ। ২০২১ সালে (অটো পাশ) শিক্ষার্থী ছিল ১ লাখ ৫৫ হাজার ৫১০। এর ভিতরে ৩৩ হাজার ৫১৯ শিক্ষার্থী ছিল বিজ্ঞান বিভাগের। বিজ্ঞানের শিক্ষার্থীর শতকরা হার ২১ শতাংশ। তবে ২০১৯ সালে বিজ্ঞানের শিক্ষার্থী ছিল ৪২ হাজার ৭৮৯। ২০২১ সালে তা কমে হয় ৩৩ হাজার ৫১৯। তিন বছরে কমার হার ২১ শতাংশ।

এ ব্যাপারে যশোর শিক্ষাবোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক প্রফেসর মাধব চন্দ্র রুদ্র বলেন, প্রতি বছরে বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমছে। শিক্ষার্থীরা মোবাইল ফোন ব্যবহার করলেও তার বিজ্ঞান সাবজেক্ট নিয়ে পড়াশুনা করতে আগ্রহ হারাচ্ছে।

বিজ্ঞানের প্রতি শিক্ষার্থীদের অনাগ্রহের কারণ জানাতে শিক্ষার্থী সাদেকুর রহমান বলেন, বিজ্ঞান বিষয় নিয়ে পড়তে বোরিং লাগে। রস, কসহীন জটিল একটা সাবজেক্ট। পড়া বুঝা যায় না। এজন্য মানবিক নিয়ে পড়ছি। ইউটিউব দেখে এখন সব কিছু শিক্ষা যায় হাতে কলমে। এজন্য বিজ্ঞান বইয়ের প্রয়োজন হয় না।

আরেক শিক্ষার্থী সেতু খান বলেন, নবম শ্রেণিতে বিজ্ঞান নিয়েছিলাম। পরে সাবজেক্ট পরিবর্তন করেছি। কারণ, অনেক কঠিন সাবজেক্ট। শুধু টিউশন নিতে হয়। পরিবারের এতো অর্থ ছিল না এজন্য আর পড়া হয়নি।

যশোর ক্যান্টমেন্ট কলেজের মনোবিজ্ঞানের শিক্ষক ইসমত আরা বলেন, বিজ্ঞান পঠন-পাঠন অপেক্ষাকৃত কঠিন। সে জন্য বিজ্ঞানের শিক্ষার্থী তুলনামূলকভাবে কম। প্রযুক্তির অতি দ্রুত বিকাশ, বাণিজ্যের প্রসার এবং করপোরেট পুঁজির দুর্দমনীয় বিশ্বায়ন শিক্ষা ক্ষেত্রে নতুন বিন্যাসের অন্যতম কারণ। সেই সঙ্গে সিলেবাসের মাত্রাতিরিক্ত চাপ, বিজ্ঞানশিক্ষার অত্যুচ্চ ব্যয়ভার, শিক্ষায়তনগুলোতে বিজ্ঞান পাঠের অনুপযোগী পরিবেশ, বিজ্ঞানকে উপেক্ষা করে প্রযুক্তির প্রতি মাত্রাতিরিক্ত পক্ষপাত, দক্ষ শিক্ষকের অভাব, প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির অভাব ও তা ব্যবহারে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সমান অনীহা, কোচিংনির্ভরতা, কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা। এছাড়াও বিজ্ঞান শিক্ষা বাদে বর্তমান প্রজন্ম ইউটিউব দেখে বিভিন্ন আবিস্কার করছে এসব কারণে তরুণ প্রজন্মকে বিজ্ঞানবিমুখ করে তুলছে।

শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিজ্ঞানের শিক্ষার্থীরা সাধারণত বিজ্ঞান পড়ছে জিপিএ পাঁচ পাওয়ার প্রলোভনে, পিতা-মাতার মান রাখতে, উত্তীর্ণ হলে বড় চাকরি পাবে, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, আমলা হবে, সেই আশায়। পাঠ্যপুস্তক, আগ্রহ, শিক্ষক, শিক্ষাব্যবস্থা, পিতা-মাতা, সমাজ শিক্ষার্থীর অনুকূলে থাকছে না। শিক্ষা গ্রহণের সঙ্গে শিক্ষার্থীর আনন্দের কোনো সম্পর্ক থাকছে না। তাদেরকে ‘ছাইপাশ’ পড়তে বাধ্য করা হচ্ছে।

তারা বলছেন, বিজ্ঞান না পড়ার মূল কারণ পাঠ্যপুস্তক। এছাড়াও মুখস্থ বিদ্যা, শিক্ষক, শিক্ষাব্যবস্থা, শিক্ষার মান, পিতা-মাতা এবং সমাজ ব্যবস্থাও দায়ী।

যশোর শিক্ষা বোর্ডের প্রাক্তন চেয়ারম্যান শিক্ষাবিদ অধ্যাপক আমিরুল আলম খান তার এক প্রবন্ধে লিখেছেন উৎপাদনী শক্তির সার্বিক বিকাশের সঙ্গে শিক্ষা ও বিজ্ঞানের সংযোগ, যথোপযুক্ত সিলেবাস প্রণয়ন, মাতৃভাষায় বিজ্ঞানশিক্ষার প্রসার ও মানোন্নয়ন, আনন্দদায়ক বিজ্ঞানচর্চার পরিবেশ, মেধাবী শিক্ষক নিয়োগ ও তাদের দক্ষতা বৃদ্ধি, বাধ্যতামূলক ব্যবহারিক ক্লাস, তাত্ত্বিক ও ফলিত বিজ্ঞানের সমন্বয় সাধন, উপযুক্ত অবকাঠামো নির্মাণ, বিজ্ঞানানুগত্য প্রতিষ্ঠা, মেধা পাচার বন্ধ, যথোপযুক্ত কর্মসংস্থান সৃষ্টি ইত্যাদি ছাড়া বিজ্ঞান সাধনা এবং সৃজনশীলতায় আন্তর্জাতিক মান অর্জন অধরা স্বপ্নই থেকে যাবে।

আরো পড়ুন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

সর্বশেষ