অনাবৃষ্টির কারণে সেচের অভাবে অনেক চাষি সময় মত আমন চারা রোপণ করতে পাড়েননি। আর যশোর সদরের হরিণার বিলের একাংশের ফসলি জমি অধিক পরিমাণ পানির জন্য পড়ে আছে অনাবাদি। সেচের সংকট অন্যদের চাষবাদ বিঘ্নিত করলেও পানিই হরিণার বিলের চাষিদের সর্বনাশ করে ছেড়েছে। মাছের ঘের হরিণার বিলের তিন ফসলি জমি করে তুলেছে অনাবাদি। বর্ষা মৌসুম ফুরোলেও বিলের প্রায় ২ হাজার বিঘা জমি এখনো হাঁটুর ওপর থেকে কোমড় সমান পানিতে তলানো। সেসব জমিতে এখনো আমন চারা বোনা যায়নি। এদিকে আমনের চারা রোপণের সময় শেষ হতে চলল।
একের পর এক ঘের নির্মাণের কারণে হরিণার বিলে জলাবদ্ধতা স্থায়ী রূপ নিয়েছে। জলাবদ্ধতায় প্রায় দেড় হাজার বিঘার আমন চারা জমিতে পচে যায়। সেবার চারা নষ্টে চাষিদের কোটির ওপর আর্থিক ক্ষতি হয়। আর এবার বিলের পানি না সরায় আমন চারা রোপণ করতেই পারেননি চাষি। হরিণার বিল অঞ্চলের কৃষকদের দাবি, এবার ২ হাজার বিঘার কাছাকাছি জমি জলাবদ্ধ হয়ে পড়েছে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ফসলি জমি রক্ষায় বার বার তাগিদ দিলেও হরিণার বিলে সেটি উপেক্ষা করা হচ্ছে। সেখানে একের পর এক চলছে ঘের খনন। পুকুর কেটে মাটি দিয়ে চারপাশের পাড় উঁচু করে ঘিরে চলছে একর পর এক ঘের নির্মাণ। ফলে বছর বছর বাড়ছে জলাবদ্ধ জমির পরিমাণ। বিলের উর্বর তিন ফসলি জমি ধ্বংস বন্ধে সংশ্লিষ্টদেরও কোনো উদ্যোগ নেই। ফলে অনেকের আয়ের একমাত্র উৎস কৃষি সেটি বন্ধ হওয়ায় দুর্ভোগে দিনযাপন করছে বহু কৃষক পরিবার। পেশাও বদলেছেন অনেকে। মনের দুঃখে কৃষিকাজ ছেড়ে দিয়েছেন।
বিলের আশপাশের গ্রামের বাসিন্দাদের সাথে আলাপচারিতায় ঘের সৃষ্ট জলাবদ্ধতায় তাদের সর্বনাশের কথা জানা যায়।
স্থানীয়রা জানান, কারো পৌষমাস, কারো সর্বনাশ। হরিণার বিলের অবস্থাটা এখন সেরকমই। বিলে চলছে একের পর এক মাছের ঘের নির্মাণের প্রতিযোগিতা। ঘের করে লাভবান হচ্ছে মাছ চাষিরা। কিন্তু কৃষকরা হচ্ছে সর্বশান্ত। ঘেরের কারণে বাঁধাগ্রস্ত হচ্ছে বিলের পানি নিষ্কাশন। বছরের যেকোনো সময়ের বৃষ্টিতে বিল জলাবদ্ধ হয়ে পড়ছে। গতবার বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতায় ধানের চারা হাত খানেক বৃদ্ধির পর মারা যায়। আর এবার জলাবদ্ধতায় চারা লাগানোই যায়নি।
জানা গেছে, বিলের সাড়াঘুটো, বকুলনগর, রূপদিয়া, কালাবাগা, মাহিদিয়া, উত্তর সাড়াপোলসহ আরো বেশ কয়েক জায়গায় ৩০টিরও বেশি ঘের গড়ে উঠেছে। আরো অনেকে ঘের গড়ার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। স্থানীয় কৃষকরা বলেন, চাঁচড়ার হক ফিশারিজের কামাল এই সর্বনাশের হোতা। তিনি মরে গেছেন, আর তাদের মেরেও রেখে গেছেন। বিলের প্রায় ৯০ বিঘা জমিতে তিনিই প্রথম মাছের ঘের নির্মাণ করেন। এরপর তার দেখাদেখি চলতে থাকে বিলে একের পর এক ঘের নির্মাণ। আর তখন থেকেই শুরু হয়েছে বিলের পানি নিষ্কাশন সমস্যা। বৃষ্টি হলেই বিল জলাবদ্ধ হয়ে পড়ে। পরিস্থিতি এমনই অনেক জমির মালিকও বিলে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করেন। অন্য পেশাও অবলম্বন করতে হয়।
যাদব কুমার রায় নামে একজন চাষি জানান, বিলে তার ১১ বিঘা জমি আছে। কিš‘ জমি এখনো কোমড় সমান পানিতে ডুবে থাকায় আমন চারা লাগাতে পারেননি। তিনি বলেন, গত বার পানি জমে চারা মারা যাওয়ায় বিরাট অংকের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। আর এবার চারা রোপণই করতে পারেননি।
কৃষক হযরত আলীর বিলে ৬ বিঘা জমি আছে। কিন্তু বছরের বেশির ভাগ সময় সেই জমি পানিতে ডুবে থাকে। বিলের তিন ফসলি এই জমি থেকে বছরে তার একবারের বেশি ফলন আসে না। এ কারণে মাছ ধরে ও অন্য কাজ করে তাকে জীবিকা নির্বাহ করতে হয়। বকুল নগর গ্রামের সাইদুর রহমান জানান, বিলে তাদের পরিবারের ৬ বিঘা জমি আছে। কিন্তু বছরের বেশির ভাগ সময় পানিতে ডুবে থাকে। তাই সেখানে চাষাবাদ করা যায় না। তার একটি পাওয়ার টিলার ছিলো। সেটি বিক্রি করে ব্যবসা শুরুর পরিকল্পনা করেছিলেন। কিন্তু বিক্রি করতে গিয়ে ভালো দাম পাননি। তাই মনের দুঃখে সেই পাওয়ার টিলারের ওপর চায়ের দোকান দিয়েছেন। তাদের মত এখনাকার অন্য কৃষকদের ভাষ্য, এ বছর ২ হাজার বিঘার মত ফসলি জমি পানিতে তলিয়ে থাকায় তারা আমন চারা লাগাতে পারেননি।
কৃষকরা জানান, হরিণার বিলে বিদ্যমান একেকটি ঘেরের আয়তন ৫০ থেকে ৬০ বিঘা পর্যন্ত। ৩০টির অধিক এরকমক ঘের বিলের হাজার হাজার বিঘা ফসলি জমির জলাবদ্ধতার কারণ। ইদানিং নতুন করে আরো ঘের নির্মাণ চলছে।
জানা গেছে, জমির শ্রেণি পরিবর্তন করতে হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিতে হয়। জমি ভরাট, পুকুর খননসহ অন্যান্য কাজে আইন অনুযায়ী অনুমোদন নিতে হয়। তবে হরিণার বিলের কোন ঘেরের মালিক কৃষি জমির শ্রেণি পরিবর্তনের অনুমতি নেননি। সেই সেই অর্থে এই ঘেরগুলো একবারেই অবৈধ।
যশোর সদর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) এস এম মিকাইল ইসলাম জানান, জমির প্রকৃতিগত পরিবর্তন আনতে হলে অনুমোদন নিতে হয়। শ্রেণি পরিবর্তনের অনুমতি না জমি ভরাট কিম্বা খনন করা আইন সম্মত নয়। তিনি জানান, এক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে আইনগত পদক্ষেপ নেয়ার সুযোগ রয়েছে।
এ ব্যাপারে বক্তব্য জানতে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের যশোর কার্যালয়ের উপ-পরিচালক মঞ্জুরুল হক জানান, একমাস হলো তিনি নতুন এই কর্মস্থলে যোগদান করেছেন। বিষয়টি তার জানা নেই। খোঁজ-খবর নিয়ে এ বিষয়ে জানার পর বক্তব্য দেবেন।
যশোর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অনুপ দাশ জানান, এ ব্যাপারে খোঁজ-খবর নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন। জমির কৃষি শ্রেণি পরিবর্তন না করে ঘের নির্মাণ আইনের ব্যত্যয়। যদি নিয়মের ব্যতয় পাওয়া যায় আইনগত ব্যবস্থা নেবেন।

