মাথায় মাথায় ‘প্লাস্টিকের টুপি’

আরো পড়ুন

মোটরযান আইনে মোটরসাইকেল চালক ও আরোহীদের হেলমেট ব্যবহার আবশ্যক করা হলেও হেলমেটের মানের কোনো উল্লেখ নেই। এ সুযোগে কম দামি হেলমেটের ব্যবহার বাড়ছে। যাকে বলা হয় প্লাস্টিকের টুপি বা বাংলা হেলমেট। মানসম্মত হেলমেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা খুবই কম।

কম দামি হেলমেট ব্যবহারের তিনটি কারণ জানিয়েছেন মোটরসাইকেল চালকরা। প্রথমত যে কোনো মানের হেলমেট হলেই মামলা এড়ানো যায়। দামি হেলমেট ব্যবহারের প্রয়োজন হয় না। দ্বিতীয়ত দামি হেলমেট ব্যবহার করলে যেখানে সেখানে রাখলেই চুরির ভয় থেকেই যায়। তৃতীয়ত চুরি এড়িয়ে হেলমেট বোগলদাবা করে নিয়ে বেড়ানোও সম্ভব না।

এসব কারণেই চালকদের প্রথম পছন্দ কম দামের ছোটখাট হেলমেট। যা মাথায় দিলে মামলা বাঁচে, চুরি হলে ক্ষতি কম হয়, আবার যেখানে সেখানে রাখাও যায়। হেলমেটের মূল উদ্দেশ্য জীবনরক্ষা এ চিন্তা নেই বললেই চলে। তাছাড়া যারা হেলমেট ব্যবহারে সচেতনতামূলক অভিযান চালায় তারাও হেলমেট হিসেবে ‘প্লাস্টিকের টুপি’ বিতরণ করেন। তাদের দেখেও সাধারণ যেনতেন হেলমেটে উদ্বুদ্ধ হয়।
বিক্রেতারা বলছেন, কমদামের এসব হেলমেট বিক্রি আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে। দামি এবং ভালো মানের হেলমেট বিক্রি কমেছে। কমদামের এসব হেলমেট মোটেই যাত্রীকে কোনো নিরাপত্তা দিতে পারবে না। তবে মোটরসাইকেল আরোহীরা বলছেন, ট্রাফিক পুলিশের জরিমানার হাত থেকে বাঁচতে যেমন-তেমন হেলমেট হলেই হয়। আইনে তো উল্লেখ নেই কোনমানের হেলমেট ব্যবহার করতে হবে। তাই মামলা থেকে রক্ষা পেতেই তারা কমদামি হেলমেট কিনে থাকেন।

আরএন রোডের হেলমেট ব্যবসায়ী শেখ মোহাম্মদ কিবরিয়া বলেন, ভালোমানের হেলমেট যেগুলো বাইকারদের নিরাপত্তা দিতে পারে; সেগুলো সাধারণত ইন্ডিয়া, চায়না থেকে আমদানি করা হয়। যার এক একটি দুই হাজার থেকে ৩৫০০ টাকা বা তার চেয়ে বেশি দামে বিক্রি করা হয়। এগুলোর মধ্যে অন্তত দুটো স্তর থাকে। উপরে থাকে ফাইবার অংশ এবং ভেতরে থাকে এক ধরনের ফোম জাতীয় কাপড়। যেটি প্রথম স্তর থেকে আসা আঘাতের মাত্রা শোষণ করে চালক আরোহীর মাথার নিরাপত্তা নিশ্চিত করে। যার ফলে চালক বা আরোহীর মাথায় আঘাতের মাত্রা কমে যায়।
তিনি আরো বলেন, কমদামের হেলমেট যেগুলো ক্যাপ বা বাংলা হেলমেট। সেগুলো ৮শ’ থেকে ১ হাজার ২শ’ টাকার মধ্যে বিক্রি হচ্ছে। কোনো ধরনের আঘাত থেকে রক্ষা করতে পারবে এমন পরীক্ষা ছাড়াই স্থানীয় কারখানাগুলোতে তৈরি হচ্ছে এসব হেলমেট। এই হেলমেটগুলোতে নিরাপত্তা দিতে পারবে এমন কোনো স্তর নেই। ফাইবার বা প্লাস্টিক দিয়েই এক স্তরে তৈরি হচ্ছে এসব হেলমেট। এই হেলমেট কোনোভাবে হাত থেকে একটু জোরে পড়লেই ভেঙে যাবে সেখানে দুর্ঘটনা থেকে রক্ষা করার তো প্রশ্নই আসে না।’

এই দোকানে কথা হয় ক্রেতা আশরাফুল ইসলামের সাথে। তিনি বলেন, মামলা থেকে রক্ষা পেতে, পুলিশ থেকে বাঁচতেই হেলমেট দরকার। সে কারণেই কম দামের একটা হলেই হলো। জাস্ট ফরমালিটি রক্ষা করা। নিজের নিরাপত্তা বিষয়টি ভেবে ভালো হেলমেট ব্যবহার করা উচিত কী না এমন প্রশ্নের জবাবে একগাল হাসি দিয়েই জানালেন, সেটাতো অবশ্যই।’

হেলমেট বিক্রির খোঁজ নিতে নিতেই দেখা গেল মোটরসাইকেলের সামনে ছোট মেয়েকে বসিয়ে হেলমেট কিনতে এসেছেন এক দম্পতি। মোটরসাইকেলে পাশে দাঁড়িয়ে আছেন স্ত্রী। আর কম দামের হেলমেট হাতে নিয়ে দরদামে ব্যস্ত স্বামী। কম দামের হেলমেটতো কোনো নিরাপত্তাই দিতে পারবে না তারপরও কম দামের হেলমেট কেন কিনছেন জানতে চাইলে ক্রেতা আব্দুল মুন্না বলেন, ‘পরিস্থিতির কারণে বাধ্য হয়েছি। প্রস্তুতি না থাকায় কম দামের হেলমেট কিনতে হচ্ছে। পরিবারের সদস্যদের নিরাপত্তা বিষয়টি এতে উপেক্ষিত হচ্ছে কী না জানতে চাইলে স্বীকার করেই বললেন, কিছুদিন পরেই ভালো হেলমেট কিনবো।’

শিপন রহমান নামে এক ওষুধ কোম্পানির বিক্রয় প্রতিনিধি বলেন ‘হেলমেট না থাকলে রাস্তায় মোড়ে মোড়ে পুলিশ গাড়ি ধরে। মামলা দেয়, জরিমানা আদায় করে। এর থেকে বাঁচার জন্যই হেলমেট কিনলাম। মানসম্মত কি না; সেটা জানি না। তবে হেলমেট থাকলে অন্তত পুলিশ ধরবে না, মামলাও দেবে না।’
মোটরসাইকেল চালক খোকন বলেন, ‘চুরি হয়ে যাওয়ার ভয়ে কম দামের হেলমেট কিনি। একটা চুরি হলেও আরেকটা কিনে নিতে পারি। দেখা গেলো, বেশি দামে কিনলাম কিন্তু সেটা চুরি হয়ে গেলো। তখন নতুন আরেকটা কেনা কষ্টসাধ্য। আবার না কিনতে পারলে বাইক নিয়ে বের হতেও পারবো না। কারণ হেলমেট না পরলে তিন হাজার টাকার মামলা দিয়ে দেবে। এজন্য হেলমেট একটা থাকলেই হলো, ভালো-খারাপ বুঝি না।’

জাগো/আরএইচএম

আরো পড়ুন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

সর্বশেষ