ঋণ না নিয়েও খেলাপির তালিকায় শতাধিক কৃষক!

আরো পড়ুন

কৃষি ব্যাংক থেকে ঋণ না নিয়েও খেলাপির তালিকায় উঠেছে রাজবাড়ীর শতাধিক কৃষকের নাম। তাদের বাড়ি পৌঁছে গেছে ব্যাংকের লাল নোটিস। যেটি আদতে গ্রেফতারি পরোয়ানা বা মালপত্র ক্রোকের পূর্ব সতর্কীকরণ জরুরি নোটিস। এমন অনেকের নামে এ নোটিস ইস্যু হয়েছে যারা এখন বয়সের ভারে কৃষিকাজই করতে পারেন না। যে কৃষক কখনো ব্যাংক থেকে ঋণই নেননি, তার নামে জারি হওয়া এ চিঠি পেয়ে রীতিমতো হতভম্ব তারা। তাদের মধ্যে দেখা দিয়েছে আতঙ্কও।

রাজবাড়ী সদর উপজেলার খানগঞ্জ ইউনিয়নের গোবিন্দপুর গ্রামের তিন ভাই ইউসুফ মন্ডল, ছলিম উদ্দিন মন্ডল ও আজিম উদ্দিন মন্ডল। একসময় কৃষিকাজ করলেও তিন ভাই এখন বাড়িতে নাতি-নাতনিদের সঙ্গে সময় কাটান। কিছুদিন আগে তিন ভাইয়ের নামেই কৃষি ব্যাংক রাজবাড়ী শাখা থেকে লাল নোটিস আসে। সেখানে লেখা রয়েছে, তারা ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে পরিশোধ করেননি। সুদ-আসলে এখন তা দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ১৫ হাজার টাকা। অথচ কখনো ঋণের জন্য আবেদনই করেননি এ তিন ভাই। ফলে চিঠি পেয়ে দুশ্চিন্তায় পড়ে গিয়েছেন পরিবারটির সদস্যরা।

জানা গিয়েছে, ২০১৫ সালে এ তিন ভাইয়ের নাম-ঠিকানা ব্যবহার করে কৃষি ব্যাংকের রাজবাড়ী শাখা থেকে ৬০ হাজার টাকা করে ঋণ নেয় একটি চক্র। ঋণের জন্য তাদের নাম-ঠিকানা ব্যবহার করা হলেও ছবি ব্যবহার করা হয়েছে অন্য মানুষের। আবার ব্যাংকে যে জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি জমা দেয়া হয়েছে সেটিতে তাদের নাম-ঠিকানা থাকলেও এ তিন ভাইয়ের আসল জাতীয় পরিচয়পত্রের নম্বর আর জন্মতারিখের সঙ্গে মিল নেই।

শুধু এ তিন ভাই নন, খানগঞ্জ এলাকার বারেক শেখ, লতিফ শেখ, রহিমসহ অনেক কৃষকই পেয়েছেন কৃষি ব্যাংকের লাল নোটিস। ভুক্তভোগীরা বলছেন, কৃষি ব্যাংক কর্মকর্তারা ঋণ জালিয়াতি করে স্থানীয় কৃষকদের ফাঁসিয়ে দিয়েছেন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে কৃষি ব্যাংক রাজবাড়ী শাখার এক কর্মকর্তা বলেন, রাজবাড়ী সদর উপজেলার খানগঞ্জ আর মিজানপুর ইউনিয়নের শতাধিক কৃষকের নামে এমন নোটিস গিয়েছে, যারা আসলে ব্যাংক থেকে কখনো ঋণই নেননি। বিষয়টি নিয়ে কৃষি ব্যাংকের প্রধান কার্যালয় থেকে তদন্ত চলছে। তদন্ত শেষ হলে বিষয়টির কারণ বা কারা জড়িত তা বলা সম্ভব হবে।

ব্যাংকের দেয়া নোটিসের সূত্র ধরে কৃষি ব্যাংকের ঋণের কাগজপত্র বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ঋণের বিপরীতে যে জাতীয় পরিচয়পত্র জমা দেয়া হয়েছে সেখানে ঋণগ্রহীতার নাম ইউসুফ মন্ডল, পিতার নাম মৃত হারান মন্ডল এবং মায়ের নাম নুরজাহান বেগম। জন্মতারিখ হিসেবে লেখা রয়েছে ১ জানুয়ারি ১৯৭৬; গ্রাম গোবিন্দপুর, ডাকঘর খানগঞ্জ। জমা দেয়া জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপিতে ছবি অস্পষ্ট। ঠিকানা অনুযায়ী গিয়ে দেখা হয় বৃদ্ধ ইউসুফ মন্ডলের সঙ্গে, যার সত্যিকারের জাতীয় পরিচয়পত্রে জন্মতারিখ ২৭ অক্টোবর ১৯৫১। আবার ঋণ আবেদনের সঙ্গে যে পাসপোর্ট সাইজ ছবি যুক্ত করা হয়েছে সেটিও তার নয়।

ইউসুফ মন্ডল বলেন, আমি বা আমার ভাইয়েরা কখনো কৃষি ব্যাংক থেকে ঋণ নিইনি। ২০ বছর আগে একবার ব্যাংকে ঋণের জন্য গিয়েছিলাম। কিন্তু তখন নানা কাগজপত্র আর শর্ত পূরণ করতে না পারায় আমরা ঋণ নিতে পারিনি। অথচ সেই একই ব্যাংক পরে আমার নামে অন্যজনকে ঋণ দিয়েছে। ব্যাংক কর্মকর্তারা জড়িত না থাকলে এটি কখনই করা সম্ভব না।

এরপর কৃষি ব্যাংকে জমা দেয়া ইউসুফ মন্ডল নামের জাতীয় পরিচয়পত্রের নম্বর ধরে অনুসন্ধান চালানো হয়। নির্বাচন কমিশন অফিস জানায়, এ নম্বরের জাতীয় পরিচয়পত্রটি ইস্যু হয়েছে মো. খবির উদ্দিন শেখের নামে, যার পিতা খোরশেদ আলী শেখ, গ্রাম গোবিন্দপুর, ডাকঘর খানগঞ্জ, রাজবাড়ী। তার জন্মতারিখ ১ জানুয়ারি ১৯৭৬। নির্বাচন কমিশনের দেয়া জাতীয় পরিচিতি তথ্যে যে ছবি ব্যবহার করা হয়েছে সেই ছবি আর কৃষি ব্যাংকের ঋণের ফাইলের ছবি একই ব্যক্তির।

তবে এ বিষয়ে খবির উদ্দিনের সঙ্গে কথা বলা যায়নি। সাংবাদিক পরিচয় পেয়েই তিনি দৌড়ে পালিয়ে যান। কথা বলেননি বাড়িতে থাকা তার স্ত্রীও।

একই গ্রামের বারেক শেখ ও তার ছেলে লতিফ শেখ কৃষি ব্যাংকের ঋণখেলাপের লাল নোটিস পেয়েছেন। বারেক শেখ বলেন, আমার ছেলে কৃষিকাজ করে। বয়স হয়ে যাওয়ার কারণে আমি কোনো কাজ করতে পারি না। ঋণ নেয়া তো দূরের কথা, রাজবাড়ীর কৃষি ব্যাংক কোথায় সেটাও আমি জানি না, কখনো ব্যাংকে যাইনি। এখন নোটিস এসেছে যে আমাদের দুজনের কাছে ব্যাংক ১ লাখ ১৫ হাজার টাকা পায়। এ নোটিস পেয়ে কী করব বুঝতে পারছি না।

বারেক শেখের পাঠানো নোটিস নিয়ে খোঁজ করে দেখা যায়, তার নামে কাগজপত্র তৈরি করে ঋণ নিয়েছেন রাজবাড়ী সদর উপজেলার খানগঞ্জ ইউনিয়নের দাদপুর গ্রামের শাহিন খান। তার বাবার নাম মনছের আলী। রাজবাড়ী সদর উপজেলার বেলগাছী রেলস্টেশনের পাশে শাহিন খানের একটি ওয়ার্কশপের দোকান আছে। বিষয়টি নিয়ে তার সঙ্গেও কথা বলা যায়নি। তিনিও কথা বলতে গেলে বুঝতে পেরে পালিয়ে যান।

এছাড়া আলিম মন্ডল নামে একজনকে খুঁজে পাওয়া যায়, যার বাড়িও সদর উপজেলার খানগঞ্জ ইউনিয়নে। আলিম মন্ডল জানান, ২০১৫ সালে কৃষি ব্যাংক, রাজবাড়ী শাখার তত্কালীন কর্মকর্তা রেজাউল হকের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। তখন আলিমই তাকে কৃষি ব্যাংক থেকে ঋণের ব্যবস্থা করে দিতে অনুরোধ করেন। এরপর রেজাউল হক সব কাগজপত্র তৈরি করে দেন। এমনকি আলিম মন্ডলের বাড়ি ছাড়া কোনো জমি না থাকলেও তার কাগজ তৈরি করে দেন রেজাউল। এসবের পরিপ্রেক্ষিতে ৭০ হাজার টাকা ঋণ পান আলিম। সেখান থেকে রেজাউল ৩০ হাজার টাকা রেখে বাকি ৪০ হাজার টাকা আলিমকে দেন।

আলিম মন্ডল বলেন, এরপর কিছুদিন রেজাউল হক আমার কাছে ফোনে ঋণের টাকা চান। আমি তাকে জানিয়ে দিয়েছি, ঋণ ব্যাংক থেকে নিয়েছি ব্যাংকে টাকা দেব। আপনার কাছে দেব না। আমি ব্যাংকের কোনো নোটিসও পাইনি, টাকাও দিইনি। তাদের এলাকায় কৃষি ব্যাংক থেকে এমন অনেককেই রেজাউল হক ঋণের ব্যবস্থা করে দিয়েছেন।

অভিযুক্ত ব্যাংক কর্মকর্তা রেজাউল হক বর্তমানে কৃষি ব্যাংক, শরীয়তপুর আঞ্চলিক অফিসে কর্মরত। তার বিরুদ্ধে ওঠা এসব অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি বলেন, সব ঋণই সঠিকভাবে বিতরণ করা হয়েছে। ঋণ বিতরণে কোনো অনিয়ম হয়নি। অনেক কৃষক ঋণ নিয়ে নানা কারণে পরিশোধ করতে চান না, সেজন্যই হয়তো নোটিস গিয়েছে।

এ বিষয়ে কৃষি ব্যাংক, রাজবাড়ী শাখার বর্তমান ব্যবস্থাপক মোতাহার হোসেন জানান, তিনি রাজবাড়ী শাখায় সদ্য যোগ দিয়েছেন। এ ঋণের বিষয়ে বিস্তারিত জানেন না। তবে এটুকু জানেন, এ ঋণগুলো ২০১৫ সালে বিতরণ করা হয়েছিল। অভিযোগ ওঠার পর ঋণসংক্রান্ত বিষয় নিয়ে প্রধান কার্যালয় থেকে তদন্ত করা হচ্ছে। ঋণসংক্রান্ত সব তথ্য ও কাগজপত্র তদন্ত কমিটি সিলগালা করে রেখেছে। সে কারণে এ বিষয়ে বিস্তারিত বলা সম্ভব নয়। তদন্ত শেষ হলেই বিষয়টির সুহারা করা যাবে।

আরো পড়ুন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

সর্বশেষ