নিজস্ব প্রতিবেদক: যশোরের চৌগাছার এবিসিডি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শাহজাহান কবীরের বিরুদ্ধে নিজের স্ত্রীকে সহকারী শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দিতে সার্টিফিকেট জালিয়াতি, নিয়োগ বোর্ডের রেজুলেশনে ফ্লুইড মেরে পদের নাম পরিবর্তন, ভুয়া নিয়োগ দেয়া, তথ্য গোপন করে মানথলি পেমেন্ট অর্ডারভূক্ত (এমপিওভূক্ত) করানোসহ নানা অভিযোগ উঠেছে। এছাড়াও সুমন মন্ডল নামে আরেক সহকারী শিক্ষককেও একইভাবে নিয়োগ দিয়েছেন তিনি। ওই শিক্ষককেও বিদ্যালয়টির অন্য শিক্ষক এবং শিক্ষকরা কোনও দিন বিদ্যালয়ে না দেখলেও তিনিও এমপিওভুক্ত হয়েছেন।
এ বিষয়ে যাবতীয় তথ্যপ্রমাণসহ মাঠচাকলা গ্রামের মামুন কবির যশোরের জেলা প্রশাসকের নিকট ওই প্রধান শিক্ষক ও তাঁর স্ত্রী মোছাম্মাৎ খাদিজা খাতুনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে আবেদন করেছেন। আবেদনের অনুলিপি তিনি মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তর, ঢাকা, যশোর জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা, চৌগাছা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এবং উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তার কাছে দিয়েছেন।
আবেদন পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে চৌগাছা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইরুফা সুলতানা বলেন, ‘বিষয়টি তদন্ত করার জন্য উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তাকে দেয়া হবে। অনিয়ম হলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেয়া হবে।’
অভিযোগসূত্রে জানা যায়, প্রধান শিক্ষকের স্ত্রী খাদিজা খাতুন ১৯৯২ সালে মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড থেকে ২য় বিভাগে দাখিল পাশ করেন, ১৯৯৫ সালে যশোর বোর্ড থেকে তিনি ২য় বিভাগে এইচএসসি পাশ করেন। এরপর উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএ(পাশ) করেন ২০০৫ সালে। এরপর জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ২০১০সালে বিএড পাশ করেন।
অথচ ২০০২ সালের ২৪ ডিসেম্বর এবিসিডি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা প্রধান শিক্ষক মিজানুর রহমানের স্বাক্ষর জালিয়াতি করে খাদিজা খাতুনকে সহকারী শিক্ষিকা হিসেবে নিয়োগপত্র দেয়া হয়। সেই নিয়োগপত্রের সূত্র ধরে ২০০৩ সালের ১ জানুয়ারী তিনি বিদ্যালয়ে যোগদান করেন মর্মে যোগদানপত্র রয়েছে এবং নিয়োগপত্র ও যোগদানপত্রে খাদিজা খাতুনের পিতার ঠিকানা ব্যবহার করা হয়েছে। ২০১৮ সালের ১ জানুয়ারী বিদ্যালয়ের বর্তমান প্রধান শিক্ষক শাহজাহান কবীর স্বাক্ষরিত শিক্ষক/কর্মচারী তথ্য ছকে খাদিজা খাতুনকে সহকারী শিক্ষিকা (ইংরেজি) হিসেবে ননইনডেক্সধারী (ননএমপিওভূক্ত) শিক্ষক হিসেবে দেখিয়ে শিক্ষা অফিসে জমা দেয়া হয়। সেখানে খাদিজা খাতুনকে ২০০১ সালে বিএ পাশ দেখিয়ে বিদ্যালয়ে যোগদানের তারিখ দেখানো হয়েছে ২০০৩ সালের ১ জানুয়ারী। সেখানে আরও দেখানো হয়েছে খাদিজা খাতুন এসএসসি পাশ করেছেন ১৯৯২ সালে।
অথচ ২০১৫ সালের ১২তম শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষায় তাঁর আবেদনপত্রে দেখা যায় তিনি তথ্য দিয়েছেন ২০০৫ সালে তিনি বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএ পাশ করেছেন। সেখানে তিনি মাদরাসা শিক্ষা বোর্ড থেকে ১৯৯২ সালে দাখিল পাশ করেছেন বলে উল্লেখ রয়েছে। এই আবেদনে তিনি স্বামী শাহাজান কবীরের ঠিকানা ব্যবহার করেছেন।
২০১৮ সালের ১ জানুয়ারী তারিখেই বর্তমান প্রধান শিক্ষক শাহাজান কবীরের স্বাক্ষরিত আরেকটি তথ্য ছকে একই শিক্ষক খাদিজা খাতুনকে কোন বিষয় উল্লেখ না করে শুধুমাত্র সহকারী শিক্ষিকা হিসেবে ২০১৫সালের ১ অক্টোবর যোগদানকৃত হিসেবে দেখানো হয়েছে। এই তথ্য ছকেও খাদিজাকে ২০০১ সালে বিএ পাশ এবং ১৯৯২ সালে এসএসসি পাশ হিসেবে দেখানো হয়েছে। অথচ অন্য যেসব শিক্ষক মাদরাসা বোর্ড থেকে দাখিল পাশ করেছেন তাদের দাখিল পাশ হিসেবেই দেখানো হয়েছে। এবং এই নিয়োগ দেখিয়ে খাদিজা খাতুনকে এমপিওভুক্ত করা হয়েছে। গত মে-২০২২ সালের এমপিও সিটে খাদিজা খাতুনকে সহকারী শিক্ষক (বাংলা) হিসেবে এমপিওভুক্ত করা হয়েছে। তাঁর এমপিও ইনডেক্স দেখানো হয়েছে এন-৫৬৮২১৯৭২। অথচ প্রধান শিক্ষকের স্ত্রী খাদিজা খাতুন বিদ্যালয়ে কখনও ক্লাস করেন না।
একইভাবে বিদ্যালয়ে কখনও ক্লাস না করা জনৈক সুমন মন্ডলকে এভাবে জালিয়াতি করে নিয়োগ দেখানো হয়েছে। তারও মে-২০২২ মাসের এমপিও সিটে নাম রয়েছে। তাঁর ইনডেক্স দেখানো হয়েছে এন-৫৬৮২১৯৭৩। তাকে সমাজ বিজ্ঞানের শিক্ষক হিসেবে দেখানো হয়েছে। বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা বলেছেন এমন নামের কোন শিক্ষককে তাঁরা চেনেন না। এবং এরা কোনদিন বিদ্যালয়ে ক্লাসও নেননি ও আসেননি।
এ বিষয়টি অনুসন্ধান করতে গিয়ে সামনে আসে আরেক মজার তথ্য। হাতে আসে ২০১৫ সালে খাদিজার নিয়োগ বোর্ডের রেজুলেশন। ২০১৫ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর ওই নিয়োগ বোর্ড উপজেলা শিক্ষা অফিসে অনুষ্ঠিত হয় বলে দেখানো হয়েছে। সেখানে বিদ্যালয়ের সভাপতি ও হাকিমপুর ইউপি চেয়ারম্যান মাসুদুল হাসান, ডিজির প্রতিনিধি হিসেবে যশোর জিলা স্কুলের শিক্ষক ফরিদুল ইসলাম, উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা ওয়াহেদুজ্জামান,অভিভাবক সদস্য জমশের আলী এবং প্রধান শিক্ষক শাহাজান কবীরকে উপস্থিত দেখানো হয়েছে। সেই রেজুলেশনের প্রথম পাতায় লেখা হয়েছে ‘‘অদ্য ইং ২৫/০৯/২০১৫ তারিখে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার চৌগাছা যশোর এর কার্যালয়ে এবিসিডি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সভাপতি জনাব মোঃ মাসুদুল হাসান সাহেবের সভাপতিত্বে একজন সহকারী গ্রন্থাগারিক পদে নিয়োগের নিমিত্তে এক নিয়োগ বোর্ড অনুষ্ঠিত হয়। নিয়োগ বোর্ডের সকল সদস্যের সম্মতিক্রমে লিখিত ৩০, মৌখিক ১১ ও সনদপত্রে ০৯ মোট ৫০ নম্বরের মধ্যে পরীক্ষা নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। লিখিত পরীক্ষায় (০৪) চারজন পরীক্ষার্থী অংশগ্রহন করেন।
অথচ অপরপাতায় সভার তারিখ ২৫ সেপ্টেম্বর দেখানো হলেও স্থান দেখানো হয়েছে যশোর জেলা স্কুল, যশোর। এই পাতায় ফ্লুইড দিয়ে (ঘষামাজা করে) লেখা মোছাম্মাৎ খাদিজা খাতুন, স্বামী মোঃ শাহাজাহান কবীর প্রথম হওয়ায় তাকে সহকারী শিক্ষক (সামাঃবিঃ) পদে নিয়োগের জন্য বিদ্যালয় পরিচালনা পর্ষদকে সুপারিশ করা হলো।’’
এসব বিষয়ে জানার জন্য শিক্ষিকা খাদিজা খাতুনকে মোবাইলে কল করে পরিচয় দেয়া হলে তিনি প্রথমে বাড়ি কোথায় জানতে চান। বাড়ি কোথায় পরে বলা হবে আপনি কি এবিসিডি স্কুলে ২০০২ সালে নিয়োগ পেয়েছিলেন? তিনি বলেন হ্যা। আপানার কি এমপিওভুক্তি হয়েছে প্রশ্নে তিনি বলেন, না। আপনি কি ২০১৫ সালে ফের ওই স্কুলে নিয়োগ পেয়েছেন প্রশ্ন করার পরই চুপ হয়ে যান। ফোন রিসিভ করেই রেখে দেন। তবে এরপর একাধিকবার কল করা হলেও তিনি আর রিসিভ করেননি।
খাদিজা খাতুনের স্বামী বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শাহাজান কবীরের দুটি মোবাইল নম্বরে প্রথমে কল দিয়ে বন্ধ পাওয়া যায়। পরে দুই নম্বরেই একাধিকবার কল করা হলেও তিনি রিসিভ করেন নি। উল্টো বিভিন্ন ব্যক্তিদের দিয়ে যেন বিষয়টির নিউজ না হয় সেবিষয়ে তদবির করেন।
এবিষয়ে বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা প্রধান শিক্ষক মিজানুর রহমান বলেন, আমার সময়ে খাদিজা খাতুন নামে কাউকে নিয়োগ দেয়া হয়নি। তিনি বলেন আমার স্বাক্ষরে যে নিয়োগপত্র দেখানো হয়েছে তা সম্পূর্ণ ভুয়া। এমনকি আমার স্বাক্ষরও জাল। এ বিষয়ে আমাকে যেখানে যেয়ে স্বাক্ষ দেয়ার জন্য বলা হবে, আমি দিতে পারবো।
বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি ও হাকিমপুর ইউপি চেয়ারম্যান মাসুদুল হাসান বলেন, এসব নিয়োগের বিষয়ে আমি কিছুই জানিনা। আমাকে জানানোও হয়নি। সম্প্রতি বিষয়টি আমি জেনেছি। এরপর রেজুলেশন ও নোটিশ খাতা তলব করেছি। প্রাথমিকভাবে তাঁকে সাময়িক বহিস্কার করার প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছে বলেও তিনি জানান।
প্রসঙ্গত, প্রধান শিক্ষক শাহাজান কবীর কয়েক বছর আগে ছাত্রীর শ্লীলতাহানীর অভিযোগে অভিযুক্ত হন। প্রমাণিত হওয়ার পরেও সেসময় ক্ষমা চেয়ে তিনি পার পেয়ে যান। এছাড়া তার বিরুদ্ধে মোটা টাকার বিনিময়ে পূর্বের তারিখে ৮ম ও দশম শ্রেণির সার্টিফিকেট বিক্রির অভিযোগ রয়েছে।
জাগো/এমআই

