মুনতাসির আল ইমরান: এবার মৌসুমে বোরোর ফলনের অধিকাংশ নষ্ট হলেও যশোরের কৃষি বিভাগের কাছে ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত কোন তথ্য-পরিসংখ্যান নেই। দুর্যোগ কেটে গেলেও এখনো পর্যন্ত ক্ষতির প্রকৃত আর্থিক পরিমাণ নির্ধারণ করতে পারেনি বিভাগটি। শুধুমাত্র ক্ষতিগ্রস্ত জমির সংখ্যাগত পরিসংখ্যান ছাড়া অন্য কোন তথ্য নেই কৃষি বিভাগের কাছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর যশোরের উপ-পরিচালক কার্যালয় সূত্র বলছে, জেলায় ২২৯৬ হেক্টর জমির বোরোর ফলন ক্ষতির সম্মুখিন হয়েছে। তবে ক্ষতির পরিমান ও তার আর্থিক মূল্য কত দপ্তরটির কাছে এরকম কোন হিসেব নেই।
সম্প্রতি যশোরের বোরো চাষি এবং কৃষক সংগঠনগুলোর বক্তব্য ও কৃষি বিভাগের দেয়া তথ্য বিশ্লেষন করে ব্যাপক গড়মিল পাওয়া যায়। চাষিরা বলছেন, বেশির ভাগ জমির অর্ধেক ধান ও বিচালি পচে গেছে। কারো কারো ধান টানা বৃষ্টিতে ও জলাবদ্ধ মাঠে পড়ে থেকে অংকুরোদগম (স্থানীয় ভাষায় কলিয়ে যাওয়া) হয়ে গেছে। যেটুকু ধান রক্ষা করা গেছে কালচে বর্ণ ধারণ করেছে। ফলে বাজারে তুললে সেই ধানের ভালো দাম মিলবে না। কৃষি বিভাগের নিরূপণ করা ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ মনগড়া ও ভিত্তিহীন দাবি করছেন চাষি ও কৃষক সংগঠনের নেতৃবৃন্দরা।
যশোর সদরের লেবুতল ইউনিয়নের বীর-নারায়নপুর গ্রামের কৃষক ইসমাইল হোসেন বলেন, টানা বৃষ্টি ও শ্রমিক সংকটের কারণে আবাদি জমির অর্ধেক ধান কাটতেই পারিনি। এক বিঘা জমির অর্ধেক ধান জলাবদ্ধতায় পচে গেছে। বাদবাকী যেটুকু কাটতে পেরেছি সেই ধানের রঙ কালচে হয়ে গেছে। বেশির ভাগ বিচালিও নষ্ট হয়ে গেছে। তিনি বলেন, মাঠে কেটে রাখা ধানের বেশির ভাগ বিচালির কাদায় মাখামাখি অবস্থা। রোদে দেয়ার পর কাদাপানিতে ভেজা বিচালি একদম কালো হয়ে গেছে। শুকনো মাটি লেগে আছে বিচালিতে। গবাদি পশুও সেই বিচালি খেতে চাইছে না। ধানে এবার কোন লাভ হবে। উৎপাদন খরচও উঠবে না।
জাতীয় কৃষক-ক্ষেতমজুর সমিতির যশোর জেলা শাখার আহবায়ক মিজানুর রহমান বলেন, উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তাদের কেউ কখনও মাঠে যান না। অফিসে বসে কাজ করে বেতন তোলেন। তাদের কাছে মাঠের ফসলের ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত কোন তথ্য নেই। তিনি বলেন, মাঠের ষোল আনা ধানের দশ আনা নষ্ট হয়ে গেছে। তারপরও যদি কৃষি বিভাগ বলেন তেমন কোন ক্ষতি হয়নি তাহলে তাদের করা ক্ষয়ক্ষতির প্রতিবেদন ভিত্তিহীন ও মনগড়া।
যশোর সদরের হরিণার বিলের বোরো আবাদিরা বলছেন, তাদের আাবাদের অধিকাংশ ধান নষ্ট হয়ে গেছে। শ্রমিক সংকটের কারণে ধানের অর্ধেক মাঠেই পচে গেছে। বোরো চাষি তপন কুমার সরকার বলেন, পানিতে তলানো ধানের অনেকখানি পচে গেছে। যেটুকু কাটতে পেরেছি সেগুলোর অবস্থাও ভালো না। ধানের রঙ ভালো হয়নি ও গন্ধ বের হচ্ছে। বিচালিও পচে বারোটা বেজে গেছে।
বাংলাদেশ কৃষক সংগ্রাম সমিতির যশোর জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক হাফিজুর রহমান জানান, ধানের ক্ষতির যে হিসাব কৃষি বিভাগ বলছে সেটি ঘরে বসে করা। প্রকৃত ক্ষতির পরিমাণ আরো অনেক বেশি। তাদের করা হিসেবের চেয়েও কয়েকগুন। তিনি আরও জানান, সংগঠনের একটি কাজে সদরের ভাতুড়িয়া হরিণার বিল এলাকায় গিয়েছিলেন। একজন কৃষক শ্রমিক সংকটের কারণে বিলের দুই বিঘা জমির কাটতেই পারেননি। মাঠে পচে দুই বিঘার সবটুকু নষ্ট হয়ে গেছে।
তবে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, জেলায় এবার ১ লাখ ৫৮ হাজার ৫ হেক্টর জমিতে বোরোর আবাদ হয়েছে। ঘুর্ণিঝড় অশনির প্রভাবে মাঠে কেটে রাখা ৯৬৫ হেক্টর জমির ধান ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। এছাড়া নিচু জমি বা বিলের জমির ১৩৩১ হেক্টর ধানের ফলন ক্ষতির সম্মুখিন হয়েছেন। যার আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ এখনো নিরূপন করা যায়নি।
অধিদপ্তরের যশোর কার্যালয় সূত্রমতে, যশোর সদরে নিচু বা বিলের জমির ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৩২৭ হেক্টর, ঝিকরগাছায় ২৯৪ হেক্টর ও শার্শায় ৭১০ হেক্টর। মাঠে কেটে রাখা জমির ধান ক্ষতির সম্মুখিন হয়েছে যশোর সদরে ১০৬ হেক্টর, বাঘারপাড়ায় ৯৯ হেক্টর, চৌগাছায় ৮০ হেক্টর, ঝিকরগাছায় ১৩৫ হেক্টর, শার্শায় ৭১৩ হেক্টর, মণিরামপুরে ২১৮ হেক্টর, কেশবপুরে ৫০ হেক্টর ও অভয়নগের ৯০ হেক্টর।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর যশোরের ভারপ্রাপ্ত উপপরিচালক দীপঙ্কর দাশের মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে জানান, তিনি দপ্তরের বাইরে আছেন। পরবর্তীতে আরেকবার কল করা হলে তিনি সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন। আবারও ফোন করলে কোন সারা দেননি।
জাগো/এমআই

