পবিত্র ঈদুল ফিতরের পর আগামী দ্বাদশ জাতীয় নির্বাচন ও ২২তম জাতীয় সম্মেলন সামনে রেখে সাংগঠনিক কর্মসূচি জোরদার করতে যাচ্ছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ।
তার আগে দলের দুই সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য অ্যাডভোকেট জাহাঙ্গীর কবির নানক ও আব্দুর রহমানকে গণভবনে ডেকে একান্তে বৈঠক করেছেন আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
ঈদের আগে দুই নেতাকে গণভবনে ডেকে দলীয় সভাপতি শেখ হাসিনার বৈঠক ঘিরে জল্পনা-কল্পনা শুরু হয়েছে। অনেক নেতাই কৌতূহলী হয়ে জানতে চাচ্ছেন, কী কথা হলো তাদের সঙ্গে।
মঙ্গলবার (২৬ এপ্রিল) দুপুরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারি বাসভবন গণভবনে এই দুই নেতার সঙ্গে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার একান্তে বৈঠক হয়।
গণভবন সূত্র গণমাধ্যমকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
সূত্র জানায়, মঙ্গলবার (২৬ এপ্রিল) সকালে ১১টায় ছিল মুজিববর্ষ উপলক্ষে তৃতীয় পর্যায়ে ৩২ হাজার ৯০৪টি ভূমিহীন ও গৃহহীন পরিবারকে জমি ও গৃহ হস্তান্তরের ভার্চুয়াল অনুষ্ঠান। গণভবন থেকে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে এসব পরিবারের কাছে জমি ও ঘর হস্তান্তর করেন শেখ হাসিনা। অনুষ্ঠানে যুক্ত থেকে উপকারভোগীদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন তিনি।
গণভবন ও আওয়ামী লীগের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, আশ্রয়ণ প্রকল্পের এই অনুষ্ঠান শেষে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর দুই সদস্য জাহাঙ্গীর কবির নানক ও আব্দুর রহমানের সঙ্গে দীর্ঘ সময় ধরে একান্তে বৈঠক করেন দলের সভাপতি শেখ হাসিনা। এই বৈঠকের জন্যই দুই নেতাকে আগেই গণভবনে উপস্থিত থাকার নির্দেশ দিয়েছিলেন তিনি। পরে বৈঠকে আওয়ামী লীগ সভাপতি দলীয় কিছু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত বিষয়ে এই দুই নেতার মতামত শোনেন এবং আগামী দিনে সাংগঠনিক কর্মসূচি জোরদারের পরামর্শ দেন।
গণভবনের এই বিশেষ বৈঠকের তথ্য নিশ্চিত করেছেন বৈঠকে উপস্থিত থাকা আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য আব্দুর রহমান। তবে বৈঠকে কী ধরনের আলোচনা হয়েছে, বৈঠক থেকে দলীয় সভাপতি বিশেষ কোনো নির্দেশনা দিয়েছেন কি না- এসব বিষয়ে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
বৈঠক কিংবা বৈঠকের আলোচ্য বিষয় নিয়ে জানতে জাহাঙ্গীর কবির নানকের কোনো বক্তব্যও পাওয়া সম্ভব হয়নি।
তবে দলীয় সূত্রগুলো বলছে, সামনে আগামী সম্মেলনে কী চমক থাকবে, সে বিষয়টি রয়েছে আলোচনায়। অন্যদিকে জাতীয় সংসদের সাংগঠনিক নির্বাচনি প্রস্তুতি চলতি বছর থেকেই অনেকটা গুছিয়ে রাখার কৌশলও রয়েছে দলীয় হাইকমান্ডের। এই জাতীয় সম্মেলনের আগে সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনগুলোর কেন্দ্রীয় সম্মেলন আয়োজনের সিদ্ধান্ত রয়েছে। এসব সংগঠনের সম্মেলনের কাজ শেষ করে আওয়ামী লীগ সেপ্টেম্বর-অক্টোবর থেকে জাতীয় সম্মেলনের প্রস্তুতি নিতে চায়। সে ক্ষেত্রে ডিসেম্বর বা তার দুয়েক মাস আগেও জাতীয় সম্মেলন সম্পন্ন করার ইচ্ছা আছে দলীয় হাইকমান্ডের। এসব বিষয় সামনে রেখেই দলের এই দুই প্রভাবশালী নেতার সঙ্গে একান্তে কোনো বিষয়ে শেখ হাসিনা কথা বলে থাকতে পারেন বলে মনে করছেন দলীয় সংশ্লিষ্টরা।
আওয়ামী লীগ সূত্রগুলো বলছে, দলের ২২তম সম্মেলনেও বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সভাপতি হতে যাচ্ছেন ৪২ বছর ধরে দলটির নেতৃত্বে থাকা বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা। তবে আওয়ামী লীগ সভাপতির রানিংমেট তথা দলের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে কে দায়িত্ব পাচ্ছেন, তা নিয়ে চলছে জল্পনা-কল্পনা। এ ক্ষেত্রে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সামনে থাকায় এই সম্মেলন থেকেই ওই নির্বাচনের বৈতরণী পার করার উপযোগী চ্যালেঞ্জিং নেতৃত্ব আনতে চায় আওয়ামী লীগ। এক্ষেত্রে দুর্দিনের সহযোদ্ধারা নেত্রীর গুডবুকে এগিয়ে রয়েছেন।
দলের বর্তমান সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের এই পদে দায়িত্ব পালন করছেন টানা দ্বিতীয় মেয়াদে। এবারের সম্মেলনেও একই পদে তিনি রয়েছেন আলোচনায়। এর বাইরেও কৃষিমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক, অ্যাডভোকেট জাহাঙ্গীর কবির নানক ও আব্দুর রহমানের নামও উচ্চারিত হচ্ছে। এর বাইরেও চার জন যুগ্ম সাধারণ সম্পাদকদের মধ্যে দুয়েকজনের নামও সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দলীয় ঘরানায় শোনা যাচ্ছে। তবে বর্তমান সাধারণ সম্পাদকের বাইরে নতুন কেউ নেতৃত্বে এলে বিগত সম্মেলনগুলোর ধারাবাহিকতায় সভাপতিমণ্ডলীর সদস্যের মধ্যে থেকেই কেউ নির্বাচিত হবেন বলে সম্ভাবনাই প্রবল মনে করছেন দল সংশ্লিষ্টরা।
গঠনতন্ত্র অনুযায়ী আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব নির্বাচনের দায়িত্ব কাউন্সিলরদের। কিন্তু কাউন্সিলররা বরাবরই এ দায়িত্ব ন্যস্ত করেন আওয়ামী লীগ সভাপতির ওপর। তাই পরবর্তী সাধারণ সম্পাদক কে হবেন, তা নির্ভর করবে একেবারেই আওয়ামী লীগ সভাপতির সিদ্ধান্তের ওপর।
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, দলের সাধারণ সম্পাদক কে হচ্ছেন তা নিয়ে নানামুখী জল্পনা-কল্পনা শুরু হলেও আওয়ামী লীগ সভাপতি তার রানিংমেট হিসেবে বিশ্বস্ত ও যোগ্য এবং দুর্দিন-দুঃসময়ের পরীক্ষিতদের মধ্যেই ভরসা রাখবেন এমনটাই মনে করছেন দলের অনেকে।
প্রসঙ্গত, ২০২৩ সালের ডিসেম্বর কিংবা ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন হবে। নির্বাচন সামনে রেখে সারাদেশে তৃণমূল থেকে দল গোছাতে শুরু করেছে আওয়ামী লীগ। ঈদুল ফিতরের পর এই সাংগঠনিক কার্যক্রম আরো জোরালে হবে। এরই মধ্যে দলে যেখানেই দ্বন্দ্ব-বিভেদ, গ্রুপিং-কোন্দলের খবর মিলছে, সেখানেই কেন্দ্রের কঠোর হস্তক্ষেপ করছেন দলীয় প্রধান শেখ হাসিনা। আগামী নির্বাচন সামনে রেখে এভাবেই সাংগঠনিক বিরোধ মিটিয়ে তৃণমূল থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত দলকে সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী করে বিজয়ের বন্দরে নৌকার জয় ছিনিয়ে আনতে চায় ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। তাই কেন্দ্রীয় সম্মেলনের আগে তৃণমূল থেকে দলকে পুনর্গঠন ও ঢেলে সাজানোর কাজে সাংগঠনিক বিরোধকেই প্রধান সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করে তা দ্রুত নিরসনে কাজ করে যাচ্ছেন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা।
আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতারা বলছেন, ইদের পরেই গণভবনে আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে দলের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের বৈঠক হবে। ওই বৈঠকে তৃণমূলের সাংগঠনিক প্রতিবেদন উপস্থাপনের পাশাপাশি ডিসেম্বরে দলের ত্রিবার্ষিক কাউন্সিলের প্রস্তুতি হিসেবে দলের বিভিন্ন উপকমিটি গঠন, গঠনতন্ত্র ও ঘোষণাপত্র সংশোধনের উদ্যোগ নেয়া হতে পারে।
এছাড়া চলতি বছর দলের দুই ধাপে সব সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনের সম্মেলন করার পরিকল্পনা রয়েছে। জুন-জুলাই এবং অক্টোবর-নভেম্বর-ডিসেম্বর এই দুই ধাপে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে একই মঞ্চে ১০ থেকে ১৫ দিনের ব্যবধানে এসব সম্মেলন আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে দলটির।

