নিজস্ব প্রতিবেদক: যশোরের বহিষ্কৃত ‘বিতর্কিত’ যুবলীগ নেতা মাজহারুল ইসলাম মাজহারের সন্ত্রাসী বাহিনীর কাছে জিম্মি ইছালি ইউনিয়নের ছয়টি গ্রাম। প্রায় দশ বছর ধরে ওই এলাকায় মাজহারেরর বাহিনী হুমকি ধামকি চাঁদাবাজি করে সন্ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছে বলে এলাকাবাসীর অভিযোগ। বিভিন্ন লোকের কাছ থেকে নানান কায়দায় লাখ লাখ টাকা চাঁদাবাজির অভিযোগ উঠেছে। অনুসন্ধানে গ্রামগুলো থেকে অন্তত ৩০ জনের নাম পাওয়া গেছে, যাদের কাছ থেকে মাজহার ও তার বাহিনী ২৫ লক্ষাধিক টাকা চাঁদাবাজি করেছে। দল থেকে বহিষ্কৃত হওয়ার পর এলাকাবাসী তার বিরুদ্ধে মুখ খুলতে শুরু করেছে।
যশোর সদর উপজেলার ইছালি ইউনিয়নের রামকৃষ্ণপুর গ্রামের বাসিন্দা মাজহারুল ইসলাম মাজহার। তিনি যশোর সদর উপজেলা যুবলীগের যুগ্ম আহ্বায়ক ছিলেন। সম্প্রতি ইছালী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষককে গালিগালাজ ও হত্যার হুমকির অডিও ভাইরাল হওয়ায় দল থেকে বহিষ্কৃত হয়েছেন। তার বহিষ্কারের পর এলাকাবাসী তার বিরুদ্ধে মুখ খুলতে শুরু করেছে।
স্থানীয়রা জানিয়েছেন, ২০১৪ সালের নির্বাচনের পর থেকে ইছালি ইউনিয়নের ছয়টি গ্রাম রামকৃষ্ণপুর, কামারগন্যা, হাশিমপুর, কুতুবপুর, জয়রামপুর ও শুড়া গ্রামে সন্ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেন মাজহার। এলাকায় প্রায় ৩০/৪০ জনের একটি সন্ত্রাসী বাহিনী রয়েছে তার। হুমকি, ধামকি, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ছাড়াও গ্রামের যেকোনো বিবাদ মীমাংসায় যুক্ত হন মাজহার। এরপর দু’পক্ষের কাছ থেকেই চাঁদা আদায় করেন। জমি, পাওনা টাকা, মেয়েলি ঘটনা কিম্বা পারিবারিক বিরোধ-যাই হোক না কেন মাজহার ও তার বাহিনী সেখানে উপস্থিত হয়ে জিম্মি করে অর্থ বাণিজ্য করে।
স্থানীয়দের তথ্য অনুযায়ী, রামকৃষ্ণপুর গ্রামের রেজাউল ইসলাম, আবদুল গনি, তাইজেল, আশরাফ, আব্দুল মান্নান, তবিবব, আব্দুল আজিজ, ইন্তাজ আলী, সাইদুল ইসলাম, মিঠুন, নজরুল ইসলাম, আব্দুল্লাহ, মোছাঃ চম্পা খাতুন বেগম , নূর ইসলাম, আব্দুল মান্নান, আলতাফ হোসেন, নারায়ন হালদার, লোকমান, আব্দুল মজিদ, নুরো, জগদীশ, কামারগন্যা গ্রামের মোছাঃ সখিনা বেগম, হিদায়জুল মাস্টার, কাশেম মোল্যা, হাশিমপুরের সুভাস মাস্টার, কুতুবপুরের বাবর আলী, সিরাজুল ইসলাম, জয়রামপুরের শিখা মেম্বরসহ অন্তত ৩০ জনের কাছ থেকে ২৫ লক্ষাধিক টাকা চাঁদা আদায় করেছে। এই তালিকার বাইরেও অনেকেই মাজহারের চাঁদাবাজির শিকার হয়েছেন। তবে এখনও আতঙ্ক থাকায় অধিকাংশ মানুষই মুখ খুলতে চান না।
মাজহারের চাঁদাবাজির শিকার রামকৃষ্ণপুর গ্রামের তবিবর রহমান বলেন, তিনি সেই সময় চেঙ্গুটিয়া বাজারে কাজে ছিলেন। অথচ এলাকার একটি ঘটনায় মাজহার তাকে মামলায় জড়িয়ে দিল। পরে সেই ঝামেলা মেটানোর নামে অর্ধলক্ষাধিক টাকা নিয়েছে। তাইজেলের ছেলের সাথে বউয়ের ছাড়াছাড়ি নিয়ে শালিস মীমাংসা করে এক লাখ টাকা নিয়েছে। এলাকায় তারা হিসাব করে দেখেছেন অন্তত ২৫ লাখ টাকা চাঁদাবাজি করেছে মাজহার ও তার লোকজন।
রামকৃষ্ণপুর গ্রামের লোকমানের খালা মোছাঃ চম্পা বেগম এলাকায় সুদে কারবার করতেন। চম্পা ভারতে থাকাকালে সুদে টাকা নিয়ে বিবাদ হওয়ায় মাজহারের বাহিনীর রোষে পড়েন লোকমান। মাজহারের সন্ত্রাসীরা প্রতিনিয়ত তার বাড়িতে গিয়ে হুমকি ধামকি দিতো। পরে টাকা দিয়ে এবং ভারত থেকে চম্পাকে বাড়িতে এনে দেয়ার পর মাজহারের কবল থেকে মুক্তি পান লোকমান। আর সুদে টাকা নিয়ে বিবাদ মেটাতে চম্পাকেও দিতে হয়েছে মোটা অংকের টাকা। এ ব্যাপারে কথা বলতে চাইলে লোকমান বলেন, আমি নিরীহ মানুষ। ভ্যান চালিয়ে খাই। আমি এই নিয়ে কোনো কথা বলতে চাই না। শুধু লোকমান নন, তালিকায় নাম থাকা আরও অনেকেই ঘটনা স্বীকার করলেও আতঙ্কে নাম প্রকাশ বা বক্তব্য দিতে রাজী হননি।
রামকৃষ্ণপুরের আব্দুল মান্নান বলেন, তিনি জমি বন্ধক নিয়ে একজনকে ৫ লাখ ৯০ হাজার টাকা দিয়েছিলেন। বন্ধকের বৈধ কাগজপত্রও রয়েছে। এই টাকা আদায় নিয়ে জটিলতা হওয়ায় এর মধ্যে মাজহার ঢুকে পড়ে। পরে সন্ত্রাসী বাহিনী দিয়ে, হুমকি ধামকি দিয়ে আমাকে সাড়ে ৪ লাখ টাকা নিয়ে বন্ধক ছেড়ে দিতে বাধ্য করে। বাকী ১ লাখ ৪০ হাজার টাকা মাজহার ও লোকজন নিয়েছে।
এ সব বিষয় নিয়ে যোগাযোগ করা হলে যশোর সদর উপজেলা যুবলীগের বহিষ্কৃত যুগ্ম আহ্বায়ক মাজহারুল ইসলাম মাজহার বলেন, গোটা ইছালি ইউনিয়নে তার বিরুদ্ধে যদি কেউ অভিযোগ দেয়, তাহলে এ জীবন তিনি রাখতে চান না। তিনি মানুষের জন্য রাজনীতি করেন। করোনাকালসহ বিভিন্ন সময়ে তিনি নানাভাবে গ্রামের দরিদ্র মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন এবং এখনও দাঁড়াচ্ছেন। তার চলার পথে একটিই ভুল ইছালি স্কুলের প্রধান শিক্ষককে ফোন করা। ওই ফোন রেকর্ড এডিট করে ভাইরাল করা হয়েছে। এর জন্য দল তাকে সাময়িক বহিষ্কার করেছে। মাজহার দাবি করেন, রাজনৈতিক রেষারেষির কারণে এমন ঘটনার শিকার হতে হয়েছে।
প্রসঙ্গত, ইছালী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের কমিটি গঠন করা নিয়ে গত ৪ এপ্রিল সোমবার যশোর সদর উপজেলা যুবলীগের যুগ্ম আহ্বায়ক মাজহারুল ইসলাম মাজহার বিদ্যালয়টির প্রধান শিক্ষক রবিউল ইসলামকে মুঠোফোনে হুমকি দেন। এর কথোপকথনের একটি অডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ভাইরাল হয়। এ ঘটনায় ভুক্তভোগী প্রধান শিক্ষক রবিউল ইসলাম জীবনের নিরাপত্তা চেয়ে যশোর কোতোয়ালি মডেল থানায় সাধারণ ডায়েরি করেন।
জিডিতে তিনি উল্লেখ করেন, যশোর সদর উপজেলার ইছালী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর আগের কমিটির অগোচরে যুবলীগনেতা মাজহার ও তার সহযোগীরা এডহক কমিটির সভাপতি হিসাবে মনিরুজ্জামানকে নিযুক্ত করেন। এতে ম্যানেজিং কমিটির সদস্য ও অভিভাবকরা ওই কমিটির বিরুদ্ধে অনাস্থা আনাসহ একজন অভিভাবক হাইকোর্টে মামলা করেন। বর্তমানে এই মামলাটি চলমান রয়েছে।
এর জের ধরে মাজহার তার ফোন থেকে কমিটি অনুমোদনের জন্য আবেদন করতে বলেন। তাকে কমিটির বিষয়ে মামলা চলমান রয়েছে জানালে গালিগালাজসহ জীবননাশের হুমকি দেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। ওই জিডিতে নিরাপত্তা চেয়ে তিনি প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করেছিলেন। পরে শিক্ষককে গালিগালাজ ও হত্যার হুমকি দেয়ার ঘটনা তদন্তের অনুমতি দেয় আদালত। আর হুমকির অডিও ভাইরাল হওয়ায় মাজহারকে যুবলীগ থেকে সাময়িক অব্যাহতি দেয়া হয়। যুবলীগের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিল স্বাক্ষরিত অব্যাহতিপত্রে বলা হয়েছে, ‘যুবলীগ একটি সুশৃঙ্খল সংগঠন। কিন্তু যুবলীগ নেতা মাজহারুল ইসলাম মাজহারের বিরুদ্ধে দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গ ও গঠনতন্ত্র পরিপন্থী কার্যকলাপের সুনিদিষ্ট প্রমাণ পেয়েছে। এতে সংগঠনের ভাবমূর্তি ক্ষু্ন্ম হয়েছে। দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গ ও গঠনতন্ত্র পরিপন্থী কার্যকলাপে জড়িত থাকার কারণে সাময়িক অব্যাহতি দেওয়া হলো।’
জাগো/এমআই

