রায়হান হোসেন, চৌগাছা (যশোর): যশোরের চৌগাছার বিভিন্ন গণমাধ্যমে সেচ লাইসেন্স নিয়ে অর্থ বাণিজ্যের সংবাদ প্রকাশের পরে বেরিয়ে আসছে নানান চাঞ্চল্যকর তথ্য। নতুন লাইসেন্স, নবায়ন, লোড বৃদ্ধি সকল ক্ষেত্রেই রয়েছে অর্থ বাণিজ্য। আগে সেচে লাইসেন্স পেতে দালাল লাগলেও এখন নিয়জুল আর তার সাথে উপজেলার এক শ্রেণির সুবিধাভোগীরাই সেটি নিয়ন্ত্রণ করে বলে জানা গেছে।
উপজেলার বিভিন্ন গ্রামের সেচ লাইসেন্স প্রাপ্তরা যেমন বাঘারদাড়ির ইমদাদুল বিশ্বাস, মাংগিরপাড়ার মতিয়ার রহমান, লাইসেন্সের জন্য আবেদনকারিরা সুখপুকুরিয়ার কদম আলী, আউযুব আলী, নারায়ণপুরের ঠান্ডু বিশ্বাসসহ স্থানীয় কৃষকরা জানিয়েছেন, লাইসেন্স প্রতি ১ থেকে দেড় লাখ আর সর্বনিম্ন ৩০ হাজার টাকা করে দিলে তবেই পাওয়া যায় সেচ লাইসেন্স। টাকার চুক্তি না হলে লাইসেন্সের আবেদনটিও খুজে পাওয়া যায় না বলে জানা গেছে। যেমন নারায়নপুর গ্রামেন ঠান্ডু বিশ্বাস ২০২১ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি একটি অগভীর নলকূপের লাইসেন্সের জন্য চৌগাছা সোনালি ব্যাংকে উপজেলা সেচ কমিটির একাউন্টে ২০০ টাকা আবেদন ফি জমা দেন। কিন্তু তার আবেদনটির কোনো খোঁজ নেই।
এদিকে নিয়াজুলকে টাকা দিয়ে ম্যানেজ করতে পারলে সরকার নির্ধারিত দূরত্ব বা নিয়ম কোনোটাই বাঁধা হবেনা। কারণ যশোর বিএডিসির প্রতিনিধি (ইলেকট্রিশিয়ান) নিয়াজুল যা করবে উপজেলা সেচ কমিটির সদস্য সচিব সহকারী প্রকৌশলি জাকির হোসেনের কাছে সেটাই চূড়ান্ত এবং সেটিই উপজেলা সেচ কমিটির সভায় অনুমোদিত হয় বলেও জোর দাবি করেছেন ভূক্তভোগীরা।
তারা আরো জানিয়েছন, সেচ কমিটির সর্বশেষ সভাতেও (২০ জানুয়ারি) সেই নিয়াজুলের যাচাই বাছাই করা গ্রাহকরাই পেয়েছেন সেচ লাইসেন্স। তার মধ্য রয়েছে ৩টি গভীর নলকূপ, ৬২টি অগভীর নলকূপ, ৭টি নবায়ন এবং ২০ টি লাইসেন্সের বিদ্যুতের লোড বৃদ্ধি করা হয়েছে বলে জানাগেছে।
ভুক্তভোগীদের প্রশ্ন, তাহলে কি এই নিয়জুলই চৌগাছা উপজেলা সেচ কমিটির সদস্য সচিব?? যদি তাই না হবে তবে উপজেলাতে যতগুলো সেচ লাইসেন্সের আবেদন জমা হয় সেগুলোর সবকটির তদন্ত এই নিয়াজুল কিভাবে করে?? কেনো তাকে উপজেলার সর্বত্র এতো তোষামোদ করা হয়?? সেচ লাইসেন্সের বিষয়ে একজন ইলেকট্রিশিয়ান কেনো স্বয়ং উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যানকে পরামর্শ দিবেন?? এই সকল প্রশ্নের উত্তর খুজতে গিয়ে অভিযোগকারি এবং ভূক্তভোগীরা জানিয়েছেন, সেচ লাইসেন্সের বিষয়ে উপজেলাব্যাপী ব্যাপক দাপুটে কর্মকর্তা। এই ইলেকট্রিশিয়ান নিয়াজুল। তার কথার বাইরে লাইসেন্স হয়না।
একজন ইলেকট্রিশিয়ান কিভাবে আবেদনকারিদের আবেদন যাচাই বাছাই করেন উত্তরে উপজেলা সেচ কমিটির সদস্য সচিব যশোর বিএডিসির সহকারী প্রকৌশলি জাকির হোসেন বললেন, লোক নেই তাই ওকে দিয়ে কাজ এগিয়ে নিই। তাছাড়া সকল যাচাই বাছাই তো নিয়াজুল একা করেনা। তার সাথে কৃষি অফিস, পল্লী বিদ্যুৎ,ভূমি অফিস সবাই দেখে।
তাহলে কি সব সময় কমিটির সকল সদস্যদেরকে বা তাদের প্রতিনিধিদেরকে নিয়েই আবেদন যাচাই করা হয়ে থাকে?এমন প্রশ্নের উত্তরে চৌগাছা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সমরেন বিশ্বাস বললেন, বিএডিসি কবে মিটিং ডাকে তাই জানিনা। আর সেচ কমিটির খোজ খবর এখন আর আমাদের কাছে আসেনা বলেও জানালেন তিনি।
একই কথা বললেন উপজেলা প্রকৌশলি মনসুর আহমেদ। তিনি আরো বলেন, কিছু কমিটি আছে যার সদস্যরা সব জানেনা।
যশোর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১ এর চৌগাছা জোনাল অফিসের ডিজিএম প্রকৌশলি বিএম আবুল কালাম বলেন, আমাদেরকে চিঠি দিয়ে জানালে আমাদের অফিসের একজন ওয়ারিং পরিদর্শক পাঠিয়ে থাকি।
একজন ইলেকট্রিশিয়ান কিভাবে সেচ কমিটির সদস্য সচিবের প্রতিনিধি হয় উত্তরে যশোর বিএডিসির নির্বাহী প্রকৌশলী জামাল ফারুক বলেন, সহকারী প্রকৌশলী জাকির হোসেন চৌগাছাসহ ৬টি এলাকার দায়িত্বে আছেন। লোকবল কম তাই নিয়াজুলকে পাঠাতে হয়।
নিয়াজুলের অর্থ বাণিজ্যের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, কোনো অভিযোগ থাকলে আমাকে জানান। অর্থ বাণিজ্যের ঘটনা গণমাধ্যমে প্রকাশের কথা বললে তিনি বেশ রূঢ় স্বরে বলেন, তবে আর আমাকে জানাচ্ছেন কেনো? উত্তরে এই প্রতিবেদক যখন বলেন, দুর্নীতির বিরুদ্ধে আমি নিউজ করবো নাকি আপনাকে জানাবো? সাথে সাথে তিনি বলেন, না ঠিক আছে নিউজ করা আপনার দায়িত্ব। তারপরেও তিনি বার বার লোকবলের দোহাই দিতে থাকেন।
নিয়াজুলের এই প্রতিনিধিত্বের বিষয়ে জানতে চাইলে চৌগাছা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও উপজেলা সেচ কমিটির সভাপতি ইরুফা সুলতানা দৃঢ় কন্ঠে বলেন, একজন ইলেকট্রিশিয়ান সেচ কমিটির সদস্য সচিবের প্রতিনিধি হয়ে কাজ করতে পারবেনা।
এ বিষয়ে কথা বলতে উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ড. মোস্তানিছুর রহমানকে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।

