আধুনিক প্রযুক্তির জয়জয়কার আর সস্তা প্লাস্টিক পণ্যের দাপটে কোণঠাসা হয়ে পড়েছে যশোরের বাঘারপাড়ার ঐতিহ্যবাহী বাঁশশিল্প। বংশপরম্পরায় চলে আসা এই শিল্পটি এখন বিলুপ্তির পথে, যার ফলে জীবন-জীবিকার তাগিদে পৈতৃক পেশা ছেড়ে মাঠের কৃষি কাজ কিংবা কলকারখানায় শ্রমিকের খাতায় নাম লেখাচ্ছেন ঋষি সম্প্রদায়ের শত শত পরিবার।
একসময় গ্রামীণ জনপদে ধান ঝাড়ার কুলা, চাল ছাঁকার চালন, ধান রাখার ধামা কিংবা বড় ঝুড়ির ব্যাপক চাহিদা ছিল। ঋষি সম্প্রদায়ের নারীরা তাদের নিপুণ হাতের ছোঁয়ায় তৈরি করতেন এসব বাঁশজাত পণ্য, যার সুনাম ছিল স্থানীয় হাট-বাজার ছাড়িয়ে দূর-দূরান্ত পর্যন্ত। কিন্তু বর্তমানে বাজারে প্লাস্টিকের তৈরি হালকা, রঙিন ও টেকসই পণ্যের সহজলভ্যতা বাঁশের তৈরি পরিবেশবান্ধব এসব সামগ্রীকে প্রান্তিকে ঠেলে দিয়েছে।
কারিগরদের আর্তনাদ
পেশা পরিবর্তনের শিকার এই শিল্পের মূল কারিগর নারীরা এখন মানবেতর জীবনযাপন করছেন। ভুক্তভোগী নারীরা জানান, আগে সপ্তাহে কয়েকদিন কাজ করেই স্বাচ্ছন্দে সংসার চলত। এখন সারা মাসে একটি কুলা বিক্রি করাও কঠিন হয়ে পড়েছে।
এক প্রবীণ নারী আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন:
> “মায়েরা এই কাজ করতেন, আমরাও শিখেছি। কিন্তু এখন মানুষ আর বাঁশের জিনিস নিতে চায় না। তাই পেটের দায়ে এখন ধান কাটার মাঠে বা রাইস মিলে শ্রমিকের কাজ করছি।”
>
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, প্লাস্টিক বর্জ্য যখন বিশ্বজুড়ে পরিবেশের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে, তখন বাঁশের মতো পচনশীল ও পরিবেশবান্ধব পণ্যের সম্ভাবনা অনেক। অথচ প্রচার ও প্রসারের অভাবে এই শিল্পটি আজ মুখ থুবড়ে পড়ছে।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, গ্রামীণ এই ঐতিহ্যকে বাঁচাতে হলে কেবল আবেগ দিয়ে হবে না, প্রয়োজন আধুনিকায়ন। তাদের দাবিগুলো হলো:
* সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা: ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প হিসেবে বিশেষ বরাদ্দ।
* আধুনিক নকশা: যুগের সাথে তাল মিলিয়ে বাঁশের তৈরি গৃহসজ্জা ও শৌখিন পণ্য তৈরির প্রশিক্ষণ।
* আর্থিক সহায়তা: সহজ শর্তে ঋণ প্রদান।
* বাজারজাতকরণ: অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে শহুরে বাজারে এসব পণ্য পৌঁছে দেওয়া।
সময়ের স্রোতে হারিয়ে যেতে বসা এই শিল্পটি রক্ষা করা না গেলে যশোরের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের একটি বড় অংশ অচিরেই বিলুপ্ত হয়ে যাবে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

