হাতে-নাতে মুক্তিপণদাবিকারীকে ধরে থানায় সোপর্দ করা এবং নিখোঁজতরুণের সিম কার্ড উদ্ধার হওয়ার পরও মামলা নেয়নি যশোর কোতোয়ালি থানা পুলিশ। উল্টো ভুক্তভোগী পরিবারকে আইনি সেবা না দিয়ে হয়রানি ও দুর্ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) ফারুক আহমেদের বিরুদ্ধে। সম্প্রতি একটি গ্যাস সিলিন্ডার রিফুয়েলিং প্রতিষ্ঠান থেকে ৫ লাখ টাকা ঘুষ গ্রহণের বিতর্কের রেশ কাটতে না কাটতেই এই নতুন ঘটনায় জনমনে চরম ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
পরিবার সূত্রে জানা গেছে, যশোর শহরের জেলরোড ঘোপ এলাকার রইজুল ইসলামের ভাগ্নে মিনহাজ (১৮) গত ২৩ ফেব্রুয়ারি খুলনা তেরখাদা থেকে নড়াইল হয়ে যশোরে নানাবাড়ি আসছিলেন। রাত সাড়ে সাতটার দিকে মিনহাজের ফোন থেকেই তার পরিবারের কাছে কল আসে। ওপাশ থেকে কান্নাজড়িত কণ্ঠে মিনহাজ কথা বললেও এক ব্যক্তি তাকে মারধর করে হুমকি দেয় যে, দ্রুত টাকা না দিলে তাকে মেরে ফেলা হবে। মুক্তিপণের টাকা পাঠাতে একটি বিকাশ নম্বরও দেওয়া হয়।
পরিবারের উদ্যোগে আটক ও ওসির ভূমিকা
পরিবার ওই বিকাশ নম্বরের সূত্র ধরে শহরের মনিহার এলাকা থেকে বাঘারপাড়ার নাড়িকেলবাড়িয়া গ্রামের সজিব মোল্লা নামে এক যুবককে ধরে ফেলে। সজিবের কাছ থেকেই নিখোঁজ মিনহাজের ব্যবহৃত সিম কার্ডটি উদ্ধার করা হয়। মিনহাজের অবস্থান নিয়ে একেক সময় একেক তথ্য দিতে থাকায় তাকে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হয়। থানায় থাকাকালীন আবারও অন্য একটি নম্বর থেকে মুক্তিপণ দাবি করা হয়।
নিখোঁজ তরুণের মা ও স্বজনরা ওসির কাছে দুই হাত তুলে সাহায্যের আকুতি জানালেও তিনি বিষয়টি গুরুত্ব দেননি। ওসির দাবি, ঘটনাটি তেরখাদা বা নড়াইল এলাকার। সজিবকে জিজ্ঞাসাবাদ বা মোবাইল ট্র্যাকিং করার কোনো উদ্যোগ না নিয়ে রাত সাড়ে ১০টা পর্যন্ত বসিয়ে রেখে পরিবারটিকে থানা থেকে একপ্রকার তাড়িয়ে দেওয়া হয়। পরবর্তীতে আটক যুবককেও ছেড়ে দেওয়া হয়।
> মিনহাজের মা কান্নায় ভেঙে পড়ে বলেন, “আমি ছেলের খোঁজে দিশেহারা হয়ে ওসির পা ধরতে বাকি রেখেছিলাম। তিনি সহযোগিতা তো করলেনই না, উল্টো খারাপ আচরণ করে আমাদের বের করে দিলেন।”
এ বিষয়ে ওসি ফারুক আহমেদের কাছে জানতে চাইলে তিনি বিরক্তির সুরে বলেন, “মিনহাজ অন্য এলাকা থেকে আসছিল, এটি ওই থানার বিষয়। আমরা কেন অন্যের ঝামেলা মাথায় নেব?” এমনকি আসামিকে সংশ্লিষ্ট থানায় নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দিয়ে তিনি নিজের দায়িত্ব এড়িয়ে যান।
উল্লেখ্য যে, গত রোববার মধ্যরাতে শহরতলীর কানাইতলা এলাকায় একটি গ্যাস সিলিন্ডার প্রতিষ্ঠানে অভিযান চালিয়ে ৫ লাখ টাকা ঘুষ নিয়ে ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে এই ওসির বিরুদ্ধে। মাত্র দুই দিনের ব্যবধানে পুনরায় এমন অমানবিক আচরণ ও দায়িত্ব অবহেলার ঘটনায় যশোরের পুলিশিং কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের প্রতিক্রিয়া
যশোরের পুলিশ সুপার সৈয়দ রফিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, বিষয়টি তার জানা ছিল না। তবে তিনি খোঁজখবর নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন।
সচেতন মহলের মতে, একজন আসামিকে ভুক্তভোগী পরিবার ধরে দেওয়ার পরও তাকে ছেড়ে দেওয়া এবং মামলা না নেওয়া কেবল দায়িত্ব অবহেলা নয়, বরং আইনি কর্তব্য থেকে সরাসরি বিচ্যুতি। ওসি ফারুক আহমেদের বিরুদ্ধে ওঠা ধারাবাহিক এসব অভিযোগ তদন্ত করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

