আজও অমাবস্যা-পূর্ণিমায় যন্ত্রণায় কাতরাই: বাহাউদ্দিন নাছিম

আরো পড়ুন

আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম দীর্ঘদিন ছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সহকারী একান্ত সচিব। এর আগে তিনবার ছিলেন দলের সাংগঠনিক সম্পাদক।

আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক লীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি তিনি। ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলায় যারা আহত হয়েছিলেন তাদের মধ্যে তিনিও একজন। এ গ্রেনেড হামলার বর্ণনা দিতে গিয়ে কণ্ঠ যেন তার রুদ্ধ হয়ে যাচ্ছিল। এখনো তিনি অমাবস্যা-পূর্ণিমায় যন্ত্রণায় কাতরান।

তিনি ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলার ভয়াবহ ঘটনা তুলে ধরে বলেন, ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার নারকীয় দৃশ্য ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না। প্রথমে আমার কোনো জ্ঞান ছিল না। কিন্তু কিছুক্ষণ পর জ্ঞান ফেরে। তখন মনে হয়েছিল মরেও বেঁচে আছি। আমার সামনে লাশ আর লাশ। কেউ আহত হয়ে যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছেন। কারও পা নেই। চারদিকে রক্ত আর রক্ত। মনে হয়েছিল কেয়ামত হয়ে গেছে। সন্ত্রাসবিরোধী সমাবেশে আসা নারী, তরুণ, ছাত্র, সাংবাদিক সবার একই অবস্থা। সবাই দিগি^দিক ছোটাছুটি করছে। আমি বেঁচে থাকব তা ভাবিনি। স্বাভাবিক জীবনে আবার ফিরে আসতে পারব কখনো মনে হয়নি। এখনো অমাবস্যা-পূর্ণিমা এলে যন্ত্রণায় কাতরাই। প্রচণ্ড রকমের ব্যথা অনুভব করি।

অসংখ্য স্প্লিন্টার নিয়ে এখনো বেঁচে আছি। প্রায়ই ব্যথা হয়। সেদিন আমাদের যথাযথ চিকিৎসা নিতে দেওয়া হয়নি। সরকারি হাসপাতালে আমাদের চিকিৎসা নিতে দেওয়া হয়নি। পরে উপায় না পেয়ে আমরা বেসরকারি হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসা নিয়েছি। সেদিন যদি সঠিক চিকিৎসা পেতাম তা হলে হয়তো এখনো এত যন্ত্রণা পোহাতে হতো না। হয়তো আইভি রহমানকে আরও কিছুদিন বাঁচিয়ে রাখা যেত। আরও দুয়েকজনকে হয়তো বাঁচানো যেত। এখনো শত শত নেতাকর্মী স্পিন্টারের যন্ত্রণা বয়ে বেড়াচ্ছেন। তারাও অমাবস্যা-পূর্ণিমায় ব্যথায় কাতরান। কিন্তু সঠিক চিকিৎসা পেলে হয়তো তারা আরেকটু ভালো থাকতেন। এমনকি আমাদের মামলাও থানায় নেয়া হয়নি। পরে সাধারণ ডায়েরি নিয়েছে থানা। কী বীভৎস একটা পরিস্থিতি ছিল। এই পরিস্থিতির কথা ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না।

বাহাউদ্দিন নাছিম বলেন, আজকের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তখন আওয়ামী লীগ সভাপতি ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ছিলেন। বিএনপি সরকারের সন্ত্রাস-দুর্নীতিবিরোধী কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদে সেদিন বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউতে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশের আয়োজন করা হয়েছিল। একটি ট্রাকে অস্থায়ী মঞ্চ তৈরি করে সমাবেশ চলছিল। সেই ঘটনা ছিল অভিশপ্ত। শেখ হাসিনা বিকাল ৫টার দিকে সমাবেশস্থলে পৌঁছান। বুলেটপ্রুফ গাড়ি থেকে নেমে নিরাপত্তাকর্মী ও দলীয় নেতাকর্মী পরিবেষ্টিত অবস্থায় তিনি অস্থায়ী মঞ্চে ওঠেন।

সমাবেশে শেখ হাসিনা বক্তব্য শুরু করেন ৫টা ২ মিনিটে। ২০ মিনিটের বক্তব্য শেষে ৫টা ২২ মিনিটে ‘জয় বাংলা’ ‘জয় বঙ্গবন্ধু’ বলে হাতে থাকা একটি কাগজ ভাঁজ করতে করতে মাইক ছেড়ে পিছিয়ে যাচ্ছিলেন। ঠিক সে সময় একজন সাংবাদিক (এসএম গোর্কি) নেত্রীকে ছবির জন্য একটি পোজ দিতে অনুরোধ করেন। তখন শেখ হাসিনা আবারও ঘুরে দাঁড়ান। আর ঠিক সেই মুহূর্তেই দক্ষিণ দিক থেকে তাকে লক্ষ্য করে একটি গ্রেনেড ছুড়ে মারা হয়। গ্রেনেডটি ট্রাকের বাঁ পাশে পড়ে বিস্ফোরিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই শেখ হাসিনা ট্রাকের ওপর বসে পড়েন। তার সঙ্গে থাকা অন্য নেতারা এ সময় মানবঢাল তৈরি করে তাকে ঘিরে ফেলেন। প্রথম গ্রেনেড হামলার মাত্র কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই ট্রাক লক্ষ্য করে একই দিক থেকে পরপর আরও দুটি গ্রেনেড নিক্ষেপ করা হয়। বিকাল ৫টা ২২ মিনিট থেকে এক-দেড় মিনিটের ব্যবধানে ১৩টি বিকট বিস্ফোরণ ঘটে। তখন ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের তৎকালীন সভাপতি প্রয়াত মেয়র মোহাম্মদ হানিফ ও সাধারণ সম্পাদক মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া, আমি (আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম), নিরাপত্তা কর্মকর্তা মেজর (অব.) শোয়েব, ব্যক্তিগত স্টাফ নজীব আহমেদসহ দেহরক্ষীরা শেখ হাসিনাকে ধরে ট্রাক থেকে দ্রুত নামিয়ে তার মার্সিডিজ বেঞ্জ গাড়িতে তুলে দেন।

তিনি বলেন, আসলে সেদিন তাদের ইচ্ছে ছিল আওয়ামী লীগ সভাপতি ও আজকের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকেসহ দলকে চিরতরে নিশ্চিহ্ন করা। সেদিন টার্গেট ছিল বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনাকে হত্যা করা। আইভি রহমানসহ ২২ জন নেতাকর্মী সেদিন জীবন দিয়েছেন। ৫ শতাধিক নেতাকর্মী আহত হয়েছেন। এর মধ্যে আমি মারাত্মকভাবে যখম হই। কিন্তু সেদিন নেত্রী শেখ হাসিনা আল্লাহর রহমতে বেঁচে যান। তবে তিনি বেঁচে গেলেও শ্রবণশক্তি অনেকটা হারান। তারা চেয়েছিল শেখ হাসিনাকে হত্যা করে বাংলাদেশকে পাকিস্তান বানাতে। সাম্প্রদায়িক রাজনীতিকে পাকাপোক্ত করতে। সেদিন সফল না হওয়ায় জজমিয়া নাটক সাজানো হয়েছিল। এই হামলার পরিকল্পনা হয় হাওয়া ভবনে বসে তৎকালীন মন্ত্রিপরিষদ সদস্য ও তারেক রহমানের নির্দেশনায়। এ তথ্য তদন্তে বেরিয়ে এসেছে। তারাও একটি তদন্ত কমিটি করেছিল, সেটি হাস্যকর বিষয়ে পরিণত হয়েছিল। এমনকি সংসদ চলাকালীন অবস্থায় আমাদের এ বিষয়ে কথা বলতেও দেওয়া হয়নি। বরং খালেদা জিয়া বলেছিল, তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেত্রী শেখ হাসিনা গ্রেনেড নিয়ে সমাবেশে গিয়েছিল। সব কিছুই ছিল সাজানো।

আওয়ামী লীগের এই যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক বলেন, ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার ঘটনার পর ওই জায়গাটি যেন হয়ে পড়েছিল কারবালা প্রান্তর। বিস্ফোরণের শব্দ, আহতদের চিৎকার-আহাজারি, রক্তাক্ত নেতাকর্মীদের ছোটাছুটিতে পুরো এলাকা বিভীষিকায় হয়ে ওঠে। চারদিকে ছোপ ছোপ রক্ত আর মানুষের ছিন্নভিন্ন দেহ। বিচ্ছিন্নভাবে পড়েছিল পায়ের জুতা, সেগুলো ছিল রক্তে লাল। দলের সভাপতি শেখ হাসিনাকে সরিয়ে নেয়ার পর ট্রাক থেকে রক্তাক্ত অবস্থায় নামানো হয় আমাদের। কী ঘটছে কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। এ অবস্থায়ই রিকশা, অ্যাম্বুলেন্স, প্রাইভেটকার, বেবিট্যাক্সি, এমনকি রিকশা ভ্যানে করেও আহতদের প্রথমে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হয়। দলীয় নেতাকর্মীসহ সাধারণ মানুষ আমাদের হাসপাতালে নেয়ার কাজে এগিয়ে এলেও পুলিশ সাহায্য করেনি। সেদিন ঘটনাস্থলের দায়িত্ব থাকা অন্যতম পুলিশ কর্মকর্তা সালাউদ্দিনকে সাহায্য করার অনুরোধ জানালেও তিনি সাড়া দেননি। বরং পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ছোড়ে। নেতাকর্মীদের নির্বিচারে লাঠিপেটা করে এবং টিয়ার গ্যাস ছোড়ে।

আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম ১৯৬১ সালের ১১ নভেম্বর মাদারীপুরে জন্মগ্রহণ করেন। পড়াশোনা করেছেন বাংলাদেশ কৃষি ইনস্টিটিউটে (শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়)। তৎকালীন বাংলাদেশ কৃষি ইনস্টিটিউট শাখা ছাত্রলীগের সভাপতিও ছিলেন তিনি। ছিলেন ১৯৮১ সালে মাদারীপুর জেলা ছাত্রলীগেরও সভাপতি। সংসদ সদস্য ছিলেন মাদারীপুর-৩ আসনের।

আরো পড়ুন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

সর্বশেষ