জনস্বাস্থ্যের স্যালাইন ইউনিট বন্ধে সংকট তীব্র

আরো পড়ুন

দেশে ডেঙ্গুজ্বরের প্রকোপ ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ডেঙ্গু রোগীদের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন পড়ছে আইভি ফ্লুইড বা স্যালাইনের। কিন্তু বাজারে চলছে স্যালাইনের সংকট।

জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের (আইপিএইচ) স্যালাইন ইউনিটটি বন্ধ থাকাতেই এই সংকট এতটা তীব্র হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

প্রতিদিন ১২ হাজার ব্যাগ স্যালাইন উৎপাদনের সক্ষমতা ছিলো আইপিএইচের স্যালাইন ইউনিটটির। কিন্তু উৎপাদনের মানসম্মত চর্চা (জিএমপি) নেই, এমন অজুহাতে ২০২০ সালে ইউনিটটির উৎপাদন বন্ধ করে দেয় ঔষধ প্রশাসন অধিদফতর। সম্পূর্ণ চালু অবস্থায় একটি প্রতিষ্ঠানকে কেন তিন বছরের বেশি সময় ধরে বন্ধ রাখা হলো, সেই প্রশ্ন উঠেছে এখন।

অভিযোগ রয়েছে, বেসরকারি ওষুধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে অধিক সুবিধা দিতে দেশের একমাত্র সরকারি স্যালাইন উৎপাদন প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ করা হয়েছে। আমদানিকারক ও বেসরকারি উৎপাদকদের কাছ থেকে বিভিন্ন ধরনের সুযোগ-সুবিধা নিয়ে একটি চক্র এই কাজ করেছে। এই ইউনিট বন্ধের কারণে এখন ভুগতে হচ্ছে ডেঙ্গু আক্রান্তসহ সাধারণ রোগীদের।

এ বিষয়ে জনস্বাস্থ্য সংগ্রাম পরিষদের আহবায়ক ডা. ফয়জুল হাকিম  বলেন, দেশের মানুষের স্বাস্থ্যসেবার সুবিধা রাষ্ট্রীয়ভাবে বহাল রাখার ক্ষেত্রে অবহেলা সুস্পষ্ট। মুক্ত বাজারের নামে সরকারি প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে জীবন রক্ষাকারী স্যালাইন উৎপাদনের সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে কিছু ব্যবসায়ীর স্বার্থে। সরকারের এ ধরনের হঠকারী সিদ্ধান্তে দেশে স্যালাইন দুষ্প্রাপ্য বস্তুতে পরিণত হয়েছে এখন।

জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের মূল কাঠামো ১৯৫৩ সালে প্রতিষ্ঠা হলেও আইভি ফ্লুইড বা স্যালাইন ইউনিটটি প্রতিষ্ঠা পায় ১৯৭২-৭৩-এর দিকে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আন্তরিক সদিচ্ছায় সেখানে কলেরা স্যালাইন, গ্লুকোজ অ্যাকুয়া, গ্লুকোজ নরমাল, হার্টম্যানস সলিউশন, ৩% সোডিয়াম ক্লোরাইড ও ইনফিউশন সেট উৎপাদিত হয়ে আসছিল। আইপিএইচে উৎপাদিত স্যালাইন সব স্তরের সরকারি হাসপাতালে সরবরাহ করা হতো। এখানে ২০১৭ সালে ১১ লাখ ৬০ হাজার ব্যাগ; ২০১৮ সালে ১০ লাখ ৬০ হাজার ব্যাগ এবং ২০১৯ সালেও সমপরিমাণ ব্যাগ স্যালাইন উৎপাদন করা হয়। একই সঙ্গে এখানে ব্লাড ব্যাগ এবং রি-এজেন্টও উৎপাদিত হতো সেখানে।

প্রতিষ্ঠানটির কয়েকজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ২০১২ সালে এই প্রতিষ্ঠানের ভ্যাকসিন ইউনিট বন্ধ করা হয়। একটি ওষুধ কোম্পানিকে ভ্যাকসিন আমদানির সুবিধা দেওয়ার জন্যই এটি করা হয়েছিল। একইভাবে ২০২০ সালে স্যালাইন ইউনিট বন্ধ করা হয়েছে দুটি ওষুধ কোম্পানিকে সুবিধা দেয়ার জন্য। ইউনিটটি বন্ধে অগ্রণী ভূমিকা রাখেন স্বাস্থ্য অধিদফতরের তৎকালীন মহাপরিচালক অধ্যাপক আবুল কালাম আজাদ।

জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের স্যালাইন ইউনিট বন্ধ হওয়ার পরপরই এর প্রভাব পড়তে শুরু করে হাসপাতালের স্বাস্থ্যসেবায়। ২০২০ সালের ৮ সেপ্টেম্বর পুলিশের বিশেষ শাখা (এসবি) থেকে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়ে বিষয়টি জানানোও হয়। চিঠিতে বলা হয়, জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের স্যালাইন, ব্লাড ব্যাগ ও জৈব ওষুধ উৎপাদন বন্ধ থাকায় সাধারণ রোগীদের স্বাস্থ্যসেবা বিঘ্নিত হচ্ছে।

২০২২ সালের নভেম্বরে স্বাস্থ্য অধিদফতরের সম্মেলনকক্ষে এক সভায় স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণমন্ত্রী জাহিদ মালেক বলেছিলেন, গোপালগঞ্জে এসেনশিয়াল ড্রাগ কোম্পানির একটি প্রজেক্ট নেয়া হয়েছে। এ ক্ষেত্রে আইপিএইচ এসেনশিয়াল ড্রাগের একটি সহযোগী ইউনিট হতে পারে। তবে পরে বিষয়টি আর এগোয়নি।

চলতি বছরের ২৬ জুলাই জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ডা. নাসির উদ্দীন মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের সচিবকে আইভি ফ্লুইড উৎপাদন ইউনিট বিষয়ে একটি চিঠি দেন। চিঠিতে তিনি বলেন, ৮৩ কাঠা জমির ওপরে নির্মিত আইভি ফ্লুইড ইউনিটটির বার্ষিক উৎপাদনক্ষমতা ছিল ২১ লাখ ব্যাগ। প্রতিষ্ঠানটিতে জিএমপি গাইডলাইন অনুসরণ হয় না, এমন কারণ দেখিয়ে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর ২০২০ সালের ১৫ জুন এর লাইসেন্স বাতিল করে। অথচ বিভিন্ন শ্রেণির ৯৫ জনের জনবল, কোটি কোটি টাকার মেশিন অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে আছে। এই প্রতিষ্ঠানের উৎপাদিত ২৫ টাকার স্যালাইন বেসরকারি কোম্পানিগুলো ১০৫ টাকায় বিক্রি করে। এখান থেকে উৎপাদিত আইভি ফ্লুইড, ব্লাড ব্যাগ, ডায়াগনস্টিক রি-এজেন্ট সরবরাহ করে বছরে সরকারের ২৬ কোটি টাকা সাশ্রয় হয়। এর আগে ২৫ জুনও একই বিষয়ে সচিবকে চিঠি দেন পরিচালক। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত রোববার ১৩ আগস্ট স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের সচিব ড. মু. আনোয়ার হোসেন হাওলাদারের সভাপতিত্বে এক সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটকে কার্যকর করতে একটি পূর্ণাঙ্গ প্রস্তাব দিতে বলা হয়। তবে সভায় সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয় সাত লাখ ব্যাগ আইভি ফ্লুইড আমদানির ওপরে।

কবে নাগাদ আইভি ফ্লুইড ইউনিট চালু হতে পারে, জানতে চাইলে জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ডা. নাসির উদ্দীন বলেন, তিনি এই প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব পেয়েছেন অল্প কিছুদিন আগে। দায়িত্ব নিয়েই তিনি প্রতিষ্ঠানটির যাবতীয় সমস্যা চিহ্নিত করার চেষ্টা করছেন। সমস্যাগুলো সমাধানের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন। এই প্রক্রিয়ায় আইভি ফ্লুইড ইউনিটটি চালু করতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করছেন।

এ প্রসঙ্গে জাহিদ মালেক বলেন, আমরা এটি চালু করার উদ্যোগ নিচ্ছি। অবকাঠামো উন্নয়নে কিছুটা সময়ের প্রয়োজন।

আরো পড়ুন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

সর্বশেষ