যশোর প্রতিনিধি
মাটি খুঁড়ে পাওয়া গিয়েছিল কঙ্কাল ভর্তি ড্রাম। সেই কঙ্কালের সূত্র ধরে সাড়ে সাত মাস পর শনাক্ত হলো হত্যার শিকার হতভাগ্য যুবকের পরিচয়। জানা গেলো, আরো ছয় বছর আগে খুন হন তিনি।
২০১৬ সালে লাশ ড্রামে ভরে ফেলে দেয়া হয় পরিত্যক্ত টয়লেটের সেফটিক ট্যাংকে। ‘ক্রাইম পেট্রোলের’ মত এই ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটন করেছে পিবিআই যশোর। লাশ গুমের সাথে জড়িত তিন আসামিকে আটকও করা হয়েছে। চিহ্নিত হয়েছে প্রধান আসামিও।
হত্যাকাণ্ডের শিকার রাজীব হোসেন কাজী (৩২) খুলনার দিঘলিয়া উপজেলার চন্দোলি মহল গ্রামের ফারুক হোসেনের ছেলে। আটক তিনজন হলেন, নড়াইলের লোহাগড়া উপজেলার মঙ্গলহাটা গ্রামের নূর মিয়ার ছেলে ও যশোরের কিসমত নওয়াপাড়া এলাকার আবদার ড্রাইভারের বাড়ির ভাড়াটিয়া মোহাম্মদ সালাম (৫৫), পুরাতন কসবা এলাকার ইব্রাহিল (৩২) ও জয়নাল হাওলাদার (৩০)।

হত্যাকাণ্ডের প্রধান অভিযুক্ত পুরাতন কসবা আবু তালেব সড়কের শেখ আজিজুল হকের ছেলে শেখ সজিবুর রহমান (৩৪) অন্য একটি মামলায় কারাগারে রয়েছেন।
এই মামলার দীর্ঘ ঘটনা প্রবাহ উল্লেখ করে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) যশোরের পুলিশ সুপার রেশমা শারমিন জানান, গত বছর (২০২২) ৩০ মে যশোর শহরের পুরাতন কসবা নিরিবিলি পাড়ার বজলুর রহমান বাউন্ডারি ঘেরা জায়গায় ভবন নির্মাণের জন্য খননকাজ শুরু করেন। এ সময় পরিত্যক্ত পুরাতন টয়লেটের রিং স্লাবের কুয়ার ভিতর একটি নীল রঙ্গের প্লাস্টিকের ড্রামের মধ্যে মানুষের হাড়গোড় ও মাথার খুলি পাওয়া যায়। এ ঘটনায় পিবিআই যশোর জেলা ছায়া তদন্ত শুরু করে।
এই তদন্তকালে তারা ২০১৬ সালে পুরাতন কসবা থেকে নিখোঁজ রাজীব হোসেন কাজী নামে এক যুবকের সন্ধান পান। খুলনার দিঘলিয়া উপজেলার চন্দোলি মহল গ্রামের ফারুক হোসেনের ছেলে রাজীব যশোরে তার চাচা হাসমতের বাসায় থেকে পুরাতন কসবা আবু তালেব সড়কের শেখ আজিজুল হকের ছেলে শেখ সজিবুর রহমানের বাসা ও অফিসে কাজ করতেন।
২০১৬ সালের ২৯ মার্চ রাতে রাজিব তার পিতাকে ফোন করে তাদের খুলনার বাড়িতে আসছে বলে জানায়। কিন্তু রাজীব খুলনায় তাদের বাড়িতে যায়নি। রাজীব বাড়িতে না গেলে তার পিতা রাজীবের মোবাইল ফোনে কল করে মোবাইল ফোন বন্ধ পান। এরপর ফারুক হোসেন তার ভাই হাসমতের সাথে যোগাযোগ করেন। হাসমত জানান, ২৯ মার্চ থেকে রাজীবকে তারাও পাচ্ছেন না। কয়েকদিন পর রাজিবের মা মাবিয়া বেগম রাজীবের খোঁজে যশোরে আসেন। রাজিবের মা মাবিয়া বেগম ও চাচা হাসমত সজীবের বাসায় গিয়ে রাজিবের খোঁজ করলে সজীব জানান, রাজিব কোথায় গেছে সে তা জানে না। সে আরো বলে, তারা যেন মামলা মোকদ্দমা করে ছেলেকে উদ্ধারের ব্যবস্থা করে। রাজিবের মা ও চাচা রাজিবকে যশোর শহরের বিভিন্ন জায়গায় খোঁজ খবর করতে থাকেন। সজীবের অফিস এবং বাড়িতে ও সম্ভব্য সকল জায়গায় খোঁজাখুঁজি করে কোন সন্ধান না পেয়ে তারা নিরুপায় বাড়ি ফিরে যান।
এরপর রাজীবের পরিবারের সদস্যরা বিভিন্ন ফকির কবিরাজের কাছে যান। কবিরাজ তাদেরকে জানায়, রাজীব বেঁচে আছে সে ফিরে আসবে; অপেক্ষা করতে হবে। রাজীব ফিরে আসবে ভেবে তারা দীর্ঘদিন অপেক্ষা করে।
এদিকে, গত বছর ৩০ মে রাতে রাজীবের চাচা হাসমত রাজীবের পিতা ফারুক হোসেনকে ফোন করে জানায়, পুরাতন কসবা নিরিবিলি পাড়ার বজলুর রহমানের ঘেরা জায়গায় ভবন নির্মাণের জন্য খোড়ার সময় ড্রামের মধ্যে মানুষের হাড়গোড় ও মাথার খুলি পাওয়া গেছে। আরো জানায়, রাজীব যেখানে কাজ করত সেখানের টয়লেটের রিং স্লাবের ভিতরে ড্রামটি মাটি চাপা দেওয়া ছিল। অর্থাৎ শেখ সজীবুর রহমানের যেখানে অফিস ছিল সেখান থেকেই মানুষের কঙ্কাল পাওয়া গেছে। রাজীব নিখোঁজ হওয়ার কিছুদিন পর সজীব তার অফিস ভেঙ্গে ফেলেছিল। ফারুক হোসেন তার ভাই হাসমতের এই কথা শুনে যশোরে আসেন।

পিবিআইয়ের ছায়া তদন্তকালীন সময়ে ফারুক হোসেন পিবিআই যশোর অফিসে এসে পুলিশ সুপারকে তার ছেলেকে সনাক্তকরণের জন্য অনুরোধ করেন এবং এই সংক্রান্তে পিবিআই যশোর কার্যালয়ে ২০২২ সালের ১২ সেপ্টেম্বর একটি জিডি করা হয়। ওই জিডির সূত্র ধরে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআই যশোর জেলার এসআই জিয়াউর রহমান বিজ্ঞ আদালতের নির্দেশ গ্রহণ করে ফারুক হোসেন এবং তার স্ত্রী মাবিয়া বেগমের নমুনা নিয়ে কঙ্কালের সাথে তাদের পরিচয় সনাক্তে ডিএনএ পরীক্ষার জন্য সিআইডির ফরেনসিক বিভাগে প্রেরণ করেন। ডিএনএ পরীক্ষায় ড্রামের মধ্যে পাওয়া মানবদেহের কঙ্কালের সাথে ফারুক হোসেন ও তার স্ত্রী মাবিয়ার ডিএনএর মিল পাওয়া যায়। অর্থাৎ ড্রামের ভিতরে পাওয়া কঙ্কাল বাদীর ছেলের তা ডিএনএ পরীক্ষায় নিশ্চিত হয়। এরপর রাজীবের হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় তার পিতা ফারুক হোসেন মঙ্গলবার (১৭ জানুয়ারি) যশোর কোতোয়ালি মডেল থানায় মামলা করেন।

এদিকে, ড্রামের মধ্যে পাওয়া কঙ্কালের পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর হত্যা রহস্য উদ্ঘাটনে মাঠে নামে পিবিআই। তদন্তের মাধ্যমে হত্যাকাণ্ডে জড়িত সন্দেহে সোমবার রাতে মোহাম্মদ সালামকে গ্রেফতার করা হয়।
জিজ্ঞাসাবাদে সালাম স্বীকার করেছে, অন্য অসামিরা ভিকটিম রাজীবকে হত্যা করে সালামের সহযোগিতায় মৃতদেহ গোপন করার জন্য ড্রামে ভরে তার ব্যবহৃত রিক্সায় করে পুরাতন কসবা নিরিবিলি পাড়া শেখ সজিবুর রহমানের অফিসের টয়লেটের কুয়ার মধ্যে ফেলে দেয়। আসামি সালামকে মঙ্গলবার বিজ্ঞ সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট পলাশ কুমার দালাল’র আদালতে সোপর্দ করা হলে তিনি স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রদান করেন। মৃতদেহ বহনের কাজে ব্যবহৃত তার রিক্সাও জব্দ করা হয়েছে। এরপর মঙ্গলবার রাতে দুই আসামি ইব্রাহিম ও জয়নাল হওলাদারকে গ্রেফতার করেছে পিবিআই। বুধবার তাদের আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে।
পিবিআর পুলিশ সুপার রেশমা শারমিন জানিয়েছেন, এই হত্যাকাণ্ডের মূল আসামি সজিবুর রহমান অন্য একটি মামলায় কারাগারে আটক রয়েছে। তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা গেলে হত্যার মোটিভ উন্মোচিত হবে। তবে হত্যাকাণ্ডের প্রায় সাত বছর পর হত্যার শিকার যুবকের পরিচয় এবং জড়িতদের শনাক্ত ও আটক করা হয়েছে।
জাগো/আরএইচএম

