পাইকারি পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম বাড়ার পর খুচরা পর্যায়ে বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানিগুলোর দেয়া প্রস্তাবের ওপর গণশুনানি আজ রবিবার (৮ জানুয়ারী) শুরু হয়েছে। ছয়টি বিতরণ কোম্পানির দেয়া ২৪ শতাংশ পর্যন্ত মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাবের ওপর গণশুনানি শুরু করেছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। তবে বিইআরসি ও বিদ্যুৎ বিভাগসংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও বিদ্যমান জ্বালানি বাজার পরিস্থিতি বিবেচনায় গ্রাহক বা খুচরা পর্যায়ে বিতরণ কোম্পানিগুলোর জন্য ১০-১৫ শতাংশ পর্যন্ত দাম বাড়তে পারে।
বিইআরসির একটি সূত্র জানিয়েছে, বিতরণ কোম্পানিগুলোর দেয়া প্রস্তাব পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিশ্লেষণ করেছে কমিশনের কারিগরি মূল্যায়ন কমিটি (টিইসি)। টিইসি তাদের প্রস্তাব তৈরি করেছে। যৌক্তিক পর্যায়ে মূল্যবৃদ্ধির বিষয়টি খতিয়ে দেখেছে তারা। এক্ষেত্রে বিদ্যুতের দাম ১০-১৫ শতাংশ বৃদ্ধির সুপারিশ আসতে পারে। যদিও বিষয়টি এখনো চূড়ান্ত কিছু নয়। গণশুনানিতে সব পক্ষের মতামতের ভিত্তিতে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেবে কমিশন।
এছাড়া বিইআরসির এক সদস্য নাম অপ্রকাশিত রাখার শর্তে বলেন, গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম বাড়বেই। তবে সেটি যৌক্তিক পর্যায়ে থাকবে। সেটি ১০-১৫ শতাংশের মধ্যে থাকবে বলে আশা করছি।
দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির মধ্যেই গত ২১ নভেম্বর পাইকারি বিদ্যুতের (বাল্ক) দাম ১৯ দশমিক ৯২ শতাংশ বাড়ায় কমিশন। এর এক সপ্তাহের মধ্যেই ২০-২৪ শতাংশ পর্যন্ত বিদ্যুতের দাম বাড়াতে কমিশনে প্রস্তাব পাঠায় বিতরণকারী কোম্পানিগুলো।
আজ রাজধানীর বিয়াম ফাউন্ডেশন মিলনায়তনে গণশুনানি হবে। শুনানি কার্যক্রম শেষ না হলে আগামীকালও শুনানি চলবে। এদিকে একই দিনে একই জায়গায় বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইনের ট্যারিফের ওপরও শুনানি করবে কমিশন। সংস্থাটি জানায়, পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশ লিমিটেডের (পিজিসিবি) বিদ্যুতের সঞ্চালন ট্যারিফ পুনর্নির্ধারণের প্রস্তাবের আবেদনের ওপর এ শুনানি হবে।
এর আগে গত বছরের জুনে গ্রাহক পর্যায়ে গ্যাসের দাম বাড়ানো হয় ২২ দশমিক ৭৮ শতাংশ। এরপর আগস্টে জ্বালানি তেলের দাম ৪২-৫২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হয়। গ্যাস ও জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধিতে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম ব্যাপক হারে বেড়ে যায়। এক্ষেত্রে জনজীবনে ব্যাপকভাবে তার প্রভাব পড়ে। গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম ১০-১৫ শতাংশ বাড়লে মূল্যস্ফীতি আরো বেড়ে যাবে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।
ভোক্তা অধিকার সংগঠনগুলোর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম বাড়লে সব ধরনের পণ্যের দাম আরেক দফা বেড়ে যাবে। বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ বেড়ে গেলে সরকার বাজেট থেকে ব্যয় নির্বাহ করবে। অযৌক্তিকভাবে দাম বাড়িয়ে তা ভোক্তার কাছ থেকে আদায় করা বেআইনি বলে মন্তব্য করেন তারা।
কনউিজমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) প্রেসিডেন্ট গোলাম রহমান বলেন, বিদ্যুতায়ন সরকারের সামাজিক ও রাজনৈতিক কর্মসূচির অংশ। বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় যদি বেড়ে যায় তার খরচ বহন করতে হবে বাজেট থেকে। এ ব্যয় কমাতে ভোক্তার কাছ থেকে খরচ তোলার জন্য সরকার বিদ্যুতের দাম বাড়াতে পারে না। এটি কোনো প্রক্রিয়ার অংশ হতে পারে না। জানা যায়, দাম পুনর্নির্ধারণের ক্ষেত্রে এবার ভর্তুকি ধরা হয়েছে ১৭ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ দাম বাড়ানোর পরও বিদ্যুৎ উৎপাদন পর্যায়ে ১৭ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দেবে সরকার।
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) তথ্যমতে, বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বৃদ্ধিতে বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় প্রতিষ্ঠানটির লোকসান বাড়ছে দিন দিন। ২০২০-২১ অর্থবছরে তাদের লোকসান ছিল ১১ হাজার ৫০৯ কোটি টাকা। ২০২১-২২ অর্থবছরে আর্থিক ক্ষতি ৩১ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়। এ কারণে বিইআরসিতে বিদ্যুতের পাইকারি মূল্যহার বাড়ানোর প্রস্তাব দেয় সংস্থাটি। এরই পরিপ্রেক্ষিতে গত ২১ নভেম্বর পাইকারি পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম প্রতি ইউনিট ৫ টাকা ১৭ থেকে বাড়িয়ে ৬ টাকা ২০ পয়সা নির্ধারণ করে কমিশন। নতুন এ দাম গত ডিসেম্বর থেকে কার্যকর হয়েছে।
বিদ্যুৎ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ২০০৭ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম বেড়েছিল ১০৩ দশমিক ৭৭ শতাংশ। গ্রাহক পর্যায়ে সর্বশেষ দাম বাড়ানো হয় ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে। সে সময় বাড়ানো হয় ৫ দশমিক ৭৭ শতাংশ।

