অক্টোবর মাসের তৃতীয় সপ্তাহে ১২ হাজার ১০০ মেট্রিকটন চিনি আমদানি করে মেঘনা গ্রুপ। কাস্টমস হাউজের নিরীক্ষায় এর প্রতি কেজির দাম ৪৫ টাকা। এই চিনি পরিশোধনের পর খুচরা বাজারে বিক্রি হচ্ছে ১১০ টাকায়। সেই হিসেবে এক কেজি চিনিতে আমদানির সঙ্গে খুচরা মূল্যের ব্যবধান ৬৫ টাকা। কারণ হিসেবে ব্যবসায়ীরা দুষছেন উচ্চ শুল্ক-হারকে। তবে বাস্তবে দেখা গেছে ভিন্ন চিত্র। বিভিন্ন শুল্ক পরিশোধের পর প্রতি কেজি চিনিতে যে পরিমাণ খরচ পড়ে তার চেয়ে ২৫ থেকে ৩০ টাকা বেশি দামে বিক্রি করেন ব্যবসায়ীরা।
বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, চিনি আমদানিতে সব মিলিয়ে প্রায় ৫৫ শতাংশ শুল্ক পরিশোধ করতে হয়। সেই হিসেবে ৪৫ টাকা দরে আমদানি করা প্রতি কেজি চিনি শুল্ককর পরিশোধ করতে হয় প্রায় ২৫ টাকা। এর সঙ্গে জাহাজ ভাড়াসহ পরিশোধন ব্যয় হয় আরো প্রায় ১০ টাকা। সেই হিসেবে প্রতি কেজি চিনির দাম পড়ে ৮০ টাকা। এই ৮০ টাকার চিনিই বাজারে বিক্রি হচ্ছে ১১০ টাকায়। অর্থাৎ এক কেজি চিনি বিক্রি করে মধ্যসত্বভোগীরা মুনাফা করছেন অন্তত ৩০ টাকা।
ট্যারিফ কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, চিনি আমদানিতে নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক পরিশোধ করতে হয় ৩০ শতাংশ, ভ্যাট ১৫ শতাংশ, অগ্রিম শুল্ক-কর ৩ শতাংশ এবং অগ্রিম আয়কর ২ শতাংশ হারে পরিশোধ করতে হয়। এর বাইরে প্রতি টন চিনি আমদানিতে নির্ধারিত কর পরিশোধ করতে হয় তিন হাজার টাকা। সেই হিসেবে চিনির ওপর বিভিন্ন শুল্ক-কর দাঁড়ায় ৫৫ শতাংশ।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে চিনির বার্ষিক চাহিদা ১৯ লাখ মেট্রিকটন। মাসে গড় চাহিদা এক লাখ ৬০ হাজার মেট্রিকটন। চাহিদার বিপরীতে গত চার মাসে (জুলাই-অক্টোবর) এসেছে এক লাখ ৯৬ হাজার টন।
সোমবার (১৪ নভেম্বর) ভোগ্যপণ্যের অন্যতম পাইকারী বাজার খাতুনগঞ্জে গিয়ে দেখা যায়, আড়তগুলোতে খুব বেশি চিনি নেই। ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, গত এক সপ্তাহ ধরে বাজারে চিনির সংকট চলছে। যে কারণে প্রতিনিয়ত চিনির দাম বাড়ছে। শনিবার (১২ নভেম্বর) যেখানে খাতুনগঞ্জে প্রতি মণ (৩৭.৩২ কেজি) চিনি বিক্রি হয়েছিল তিন হাজার ৮২০ টাকা সেখানে সোমবার প্রতি মণ চিনি বিক্রি হয় তিন হাজার ৯৫০ টাকায়।
মেসার্স এমবি ট্রেডার্সের মালিক কাঞ্চন ঘোষ বলেন, চাহিদার তুলনায় বাজারে চিনির সরবরাহ অনেক কম। ১০ টন চিনির অর্ডার দিলে পাওয়া যাচ্ছে দুই থেকে তিন টন। সরবরাহ কমে যাওয়ায় বাজারে প্রতিদিন চিনির দাম বাড়ছে। শনিবার থেকে সোমবার দুই দিনের ব্যবধানে প্রতি মণ চিনির দাম বেড়েছে ১৩০ টাকা।
এদিকে বাজারে চিনি সরবরাহে সংকট দেখা দিলেও আমদানি তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, দেশে প্রতিমাসে যে পরিমাণ চিনির চাহিদা তার চেয়ে বেশি আমদানি হচ্ছে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী চলতি অর্থ বছরের গত চার মাসে সাত লাখ ৮৬ হাজার মেট্রিক টন চিনি আমদানি হয়েছে। এর মধ্যে জুলাই মাসে এক লাখ ৮২ হাজার মেট্রিক টন, আগস্ট মাসে দুই লাখ ৬৭ হাজার টন, সেপ্টেম্বর মাসে এক লাখ ৮০ হাজার টন এবং সর্বশেষ অক্টোবর মাসে আমদানি করা হয় এক লাখ ৫৪ হাজার টন।
চলতি নভেম্বর মাসের ১৪ দিনে আমদানি হয়েছে এক লাখ ৬৮ হাজার ৯২০ মেট্রিক টন। এর মধ্যে স্পিনিল নামের একটি জাহাজে করে ৬০ হাজার ৯২০ মেট্রিকটন পরিশোধিত চিনি আমদানি করা হয়। বাকি দুটি জাহাজের মধ্যে মেঘনা সান নামে একটি জাহাজে করে ৫৩ হাজার মেট্রিকটন কাঁচা (অপরিশোধিত) চিনি আমদানি করে মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রি লিমিটেড।
আমদানি পর্যাপ্ত হওয়ার পরও বাজারে চিনির দাম বাড়ছে কেন জানতে চাইলে মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রির সিনিয়র অ্যাসিসট্যান্ট ম্যানেজার তসলিম শাহরিয়ার বলেন, চিনি আমদানিতে ৫৫ থেকে ৬০ শতাংশের মতো শুল্ককর পরিশোধ করতে হয়। কম দামে চিনি বিক্রি করতে হলে সরকারকে শুল্ক-কর কমিয়ে আনতে হবে।

