সমন্বয়হীনতার বিরোধ প্রকাশ, যশোর জেলা আ.লীগকে কেন্দ্রে তলব

আরো পড়ুন

যশোর জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের মধ্যে দ্বন্দ্ব প্রকাশ্যে এসেছে। সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক শাহীন চাকলাদারের স্বাক্ষর ছাড়াই জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি শহিদুল ইসলাম মিলন একক স্বাক্ষরে মণিরামপুর, ঝিকরগাছা ও বাঘারপাড়া উপজেলা আওয়ামী লীগের পূর্ণাঙ্গ কমিটির অনুমোদন দিয়েছেন।

এর আগে জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি শহিদুল ইসলাম মিলনের সম্মতি ছাড়াই সাধারণ সম্পাদক শাহীন চাকলাদারের সম্মতিতে যশোর পৌর ও অভয়নগর উপজেলা কমিটি গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয় বলে দলের কয়েকজন নেতা জানান।

শনিবার (৩০ জুলাই) রাতে জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি শহিদুল ইসলাম স্বাক্ষরিত প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে মণিরামপুর ও ঝিকরগাছা এবং রবিবার (৩১ জুলাই) বাঘারপাড়া উপজেলা আওয়ামী লীগের কমিটির পূর্ণাঙ্গ তালিকা গণমাধ্যমে পাঠানো হয়। এ নিয়ে জেলার নেতাকর্মীরা নির্বাহী কমিটির সভা ও সভাপতি সাধারণ সম্পাদকের যৌথ স্বাক্ষর ছাড়া কমিটি অনুমোদন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাদের দাবি, দলীয় গঠনতন্ত্র না মেনে ‘পকেট কমিটি’ গঠন করা হচ্ছে।

এ বিষয়টি কেন্দ্র আওয়ামী লীগের নজরে আসায় জেলা ও সংশ্লিষ্ট উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক ও জেলা কমিটির সদস্যদের মঙ্গলবার (০২ জুলাই) ঢাকায় তলব করা হয়েছে।

যশোর জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শাহীন চাকলাদারের সম্মতিতে ৩০ মে রাতে সভাপতি অ্যাড. আসাদুজ্জামান আসাদ ও সাধারণ সম্পাদক এসএম মাহমুদ হাসান বিপুর স্বাক্ষরিত প্রেরিত তালিকায় ৭১ জন সদস্যের নাম রয়েছে। তবে এ কমিটি অনুমোদিত নয় বলে জানিয়েছিলেন জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি বীরমুক্তিযোদ্ধা শহীদুল ইসলাম মিলন। তিনি বলেছিলেন, মনগড়া কমিটি মূল্যহীন।

ওই প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, ২৭ ফেব্রুয়ারি কমিটির অনুমোদনের জন্য জেলা আওয়ামী লীগের দফতর সম্পাদকের নিকট জমা দেয়া হয়। এ কমিটিতে সহ-সভাপতিতে রয়েছেন রফিকুল ইসলাম, দেলোয়ার হোসেন, আলাউদ্দীন, আজিজুল হক, শামীম আহমেদ রনি, ফয়জুল কবির কচি, জাহাঙ্গীর আলম বাবলু, রবিউল ইসলাম শাহীন ও বাবলু কুমার নাথ।

যুগ্ম সাধারণ সম্পাদকে আছেন কাজী শহিদুল হক শাহীন, শেখ জাহিদ হোসেন মিলন ও এসএম ইউসুফ শাহিদ, আইন বিষয়ক সম্পাদকে আছেন এ্যাড. মাহবুব সরকার লাল্টু, কৃষি সম্পাদকে সেলিম কবীর, তথ্য ও গবেষণা সম্পাদকে রবিউল ইসলাম রবি, ত্রাণ ও সমাজ কল্যাণ বিষয়ক সম্পাদকে আরিফুজ্জামান বাদল, দফতর সম্পাদকে শফিকুল ইসলাম, ধর্ম বিষয়ক সম্পাদকে উজ্জ্বল হোসেন, প্রচার সম্পাদকে আনোয়ার হোসেন বাবু, বন ও পরিবেশ বিষয়ক সম্পাদকে রবিউল ইসলাম রবি, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ক সম্পাদকে আনোয়ার হোসেন সবুজ, মহিলা বিষয়ক সম্পাদকে ফারজানা ইযাসমিন, মুক্তিযোদ্ধা বিষয়ক সম্পাদকে বীর মুক্তিযোদ্ধা লুৎফর রহমান, যুব ও ক্রীড়া বিষয়ক সম্পাদক তৌহিদুজ্জামান ওয়াসেল, শিক্ষা বিষয়ক সম্পাদকে আশিকুর রহমান বাঁধন, শ্রম বিষয়ক সম্পাদকে আলী হোসেন নয়ন, সাংস্কৃতিক সম্পাদক হুমায়ুন কবীর, স্বাস্থ্য ও জনসংখ্যা বিষয়ক সম্পাদকে নাম রয়েছে নাজমুল সিদ্দিকী পলাশের।

সাংগঠনিক সম্পাদকে নাম আছে শেখ শাহাজান কবির শিপলু ও জাকির হোসেন রাজীবের। সহ-দফতর সম্পাদকে শাহীনুর রহমান শাহিন, সহ-প্রচার সম্পাদকে শেখ আলমগীর হোসেন ও কোষাধ্যক্ষে আছেন হাজী হাসান।

এছাড়া সদস্য পদে ৩৫ জনকে রাখা হয়েছে। তারা হলেন শেখ সাদেক আলী, হালিমুল হক ফরহাদ, ইমাম হাসান বাবলু, ফারুক হোসেন সিরু, সুলতান মাহমুদ পরান, খলিলুর রহমান, মফিজুর রহমান নান্টু, তোতা মোল্লা, ইদ্রিস আলী বাদল, কাজী রবিউল ইসলাম রবু, ফরহাদ হোসেন, মনিরুজ্জামান মনি, নওয়াব আলী, আলী হাসান তুষার, মফিজুর রহমান মধু, ইকবাল মুনাফ দিলু, সৈয়দ নাজমুল হক পিকুল, শেখ মোহাম্মদ রবিউল ইসলাম, পিয়ার মোহাম্মদ পিয়ারু, সিরাজুল ইসলাম সিরাজ, আলী হোসেন, ইজ্জাক হোসেন, গোলাম রসুল ডাব্লু, নূর ইসলাম নুরু, ওহিদুল আলম টুটুল, মাহফুজুর রহমান শান্টু, আসাদুজ্জামান আসাদ, গোলাম রব্বানী, ফিরোজ শেখ, শেখ শাহাজাহান শান্ত, জুলফিকার আলী, এনামুল, রবি মোল্লা, তৌফিকুর রহমান সুমন ও মিরাজ আলম।

অন্যদিকে, ৩০ জুলাই শহিদুল ইসলাম মিলনের দেয়া মণিরামপুরের কমিটিতে স্থানীয় সংসদ সদস্য ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী স্বপন ভট্টাচার্যের ছেলেসহ অন্তত ১০ আত্মীয়কে ঠাঁই দেয়া হয়েছে।

জানা যায়, ২০১৮ সালের মার্চে অধ্যক্ষ কাজী মাহমুদুল হাসানকে সভাপতি ও প্রভাষক ফারুক হোসেনকে সাধারণ সম্পাদক করে মণিরামপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের ৪ সদস্য বিশিষ্ট আংশিক কমিটি ঘোষণা করা হয়। সর্বশেষ শনিবার তাদের স্বপদে রেখেই ৭১ সদস্য বিশিষ্ট কমিটি অনুমোদন দেয়া হয়। কমিটিতে স্বপন ভট্টাচার্যের ছেলে সুপ্রিয় ভট্টাচার্যকে সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক করা হয়েছে। জেলা সভাপতি শহিদুলের ছেলে সামির ইসলাম পিয়াসের নামও রয়েছে সদস্যের তালিকায়। কমিটিতে প্রতিমন্ত্রীর অনুসারীদের প্রাধান্য দেয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। বাদ পড়া নেতাদের অভিযোগ, এলাকায় রাজনৈতিক ফায়দা লুটতে প্রতিমন্ত্রী স্বপন উপজেলা ও জেলা সভাপতিকে দিয়ে পকেট কমিটি করেছেন। গঠনতন্ত্রহীন কমিটির নামে তারা ‘মামা-ভাগ্নে’ আর পারিবারিক কমিটি করেছেন। কখনও রাজনীতি না করা ছেলে সুপ্রিয় ভট্টাচার্যকে দলের একেবারে বড় পদ দেয়া হয়েছে। এ ছাড়া প্রতিমন্ত্রীর আত্মীয়স্বজনের মধ্যে অত্যন্ত ১০ জনকে কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

মণিরামপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক প্রভাষক ফারুক হোসেন বলেন, গঠনতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় পূর্ণাঙ্গ কমিটি আবেদন করেছেন। ইচ্ছা মাফিক একতরফা কমিটি অনুমোদন দেন জেলা সভাপতি। এটা তার একক এখতিয়ারের বিষয় নয়।

জানা গেছে, সর্বশেষ সম্মেলনে উপজেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান আমজাদ হোসেন লাভলু। পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে জায়গা হয়নি তার। ঝিকরগাছা উপজেলা আওয়ামী লীগের কমিটিতে এই আসনের সাবেক সংসদ সদস্য মনিরুল ইসলাম মনিরের অনুসারীদের প্রাধান্য দেয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে অনুপ্রবেশকারীদের পুনর্বাসন করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মনিরুল ইসলাম বলেন, কমিটিতে ত্যাগীরা বঞ্চিত হয়েছে। অনুপ্রবেশকারীরা পুনর্বাসিত হয়েছে। উপজেলা জাসদের সহসভাপতি আবদুল লতিফকে সহসভাপতি করা হয়েছে। যুবদলের নেতাকেও পদে রাখা হয়েছে। ইউপি নির্বাচনে বিদ্রোহীরাও পদ পেয়েছেন। এ বিষয়ে কেন্দ্রে অভিযোগ করবেন তারা। বাঘারপাড়া উপজেলা আওয়ামী লীগের পূর্ণাঙ্গ কমিটি নিয়েও চাপা ক্ষোভ রয়েছে দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে। এতে জেলা-উপজেলার শীর্ষ নেতাদের পরিবার ও আত্মীয়স্বজনকে প্রাধান্য দেয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

এসব অভিযোগের বিষয়ে জেলা আওয়ামী লীগের উপ-দফতর সম্পাদক অহিদুল ইসলাম তরফদার বলেন, জেলার ৬টি উপজেলায় আওয়ামী লীগের পূর্ণাঙ্গ কমিটি নেই। এসব কমিটির নেতাদের নিয়ে ২ আগষ্ট বসবেন কেন্দ্রীয় দায়িত্বপ্রাপ্ত সাংগঠনিক সম্পাদক। ওই বৈঠকে কমিটি অনুমোদনের বিষয়টি চূড়ান্ত হবে।

এ বিষয়ে জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি শহিদুল ইসলাম বলেন, পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন ও অনুমোদনের বিষয়ে শাহীন চাকলাদার উদাসীন। যে কারণে আমি সভাপতি হিসেবে মণিরামপুর, ঝিকরগাছা ও বাঘারপাড়া উপজেলার পূর্ণাঙ্গ কমিটির অনুমোদন দিয়েছি। এখন সংযোজন-বিয়োজন যা করার কেন্দ্র থেকে করবে।

জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সংসদ সদস্য শাহীন চাকলাদার বলেন, জেলা আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী কমিটির দুই দফা সভায় পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠনের বিষয়টি উত্থাপন করা হয়েছে। কিন্তু সভাপতি শহিদুল ইসলাম কমিটির তালিকায় স্বাক্ষর করেননি। গঠনতন্ত্র অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট কমিটির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রস্তুত করে জেলা কমিটির কাছে পাঠাবেন। জেলা কমিটির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক সেটা অনুমোদন করবেন। কিন্তু সভাপতি দলের মধ্যে বিরোধ সৃষ্টির জন্য গঠনতন্ত্র বহির্ভূত কাজ করেছেন।

আরো পড়ুন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

সর্বশেষ