পদ্মা সেতু উদ্বোধন ঘিরে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। যে কোনো নাশকতা এড়াতে দলটির এ সতর্কতা। আগামী ২৫শে জুন সকাল ১০টায় বহুল আকাঙ্ক্ষিত পদ্মা সেতু উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ওইদিন বেলা ১১টায় কাঁঠালবাড়ী প্রান্তে সমাবেশ করবে আওয়ামী লীগ। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ছাড়াও দিনব্যাপী সেখানে নানান আয়োজন থাকবে। সেতুটির উদ্বোধন তৎপরতায় সরকারের পাশাপাশি আওয়ামী লীগও ব্যস্ত সময় পার করছে। দলটির নেতারা বৈঠকের পর বৈঠক করছেন। ধানমন্ডিতে আওয়ামী লীগ সভাপতির রাজনৈতিক কার্যালয় ও বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে থাকা আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে প্রতিদিন একাধিক বৈঠক করছেন তারা। কেন্দ্রীয় নেতারা এসব বৈঠকের সমন্বয় করছেন।
বিশেষ করে পদ্মা সেতু এলাকার নেতাদের সবচেয়ে বেশি সম্পৃক্ত করা হচ্ছে। ধানমন্ডিতে পদ্মা সেতুর উদ্বোধনী জনসভা সফল করার লক্ষ্যে যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ, ছাত্রলীগের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকের সঙ্গে মতবিনিময় সভা করা হয়েছে।
ওই বৈঠকের নেতৃত্ব দেন দলটির সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য জাহাঙ্গীর কবির নানক। সেখানে প্রস্তুতির অংশ হিসেবে তাদেরকে সতর্ক থাকার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। উদ্বোধন ঘিরে যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ, ছাত্রলীগকে ভলান্টিয়ার হিসেবে পরিস্থিতি সামাল দেয়ার কথা বলা হয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারের সবচেয়ে বড় সফলতা হিসেবে দেখা হচ্ছে পদ্মা সেতু প্রকল্পকে। তাই এ সেতুর উদ্বোধন ঘিরে বিরোধী রাজনৈতিক পক্ষরা যে কোনো ধরনের নাশকতা তৈরি করতে পারে এমন আশঙ্কা রয়েছে দলটির নেতাদের মধ্যে।
তারা জানান, জমকালো আয়োজনের মধ্য দিয়ে পদ্মা সেতু উদ্বোধনের পরিকল্পনা করা হয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারের এ সফলতা যেন ম্লান হয় সেজন্য অনেকে চেষ্টা করতে পারে। নির্বাচনের আগে যে কোনো শক্তি এটা ঘিরে ইস্যু তৈরি করতে পারে। আমরা নেতা-কর্মীদের সর্বোচ্চ পর্যায়ে সতর্ক থাকতে বলেছি। এজন্য বিরোধী রাজনীতির নেতা-কর্মীদের পর্যবেক্ষণে রাখা হবে। কেউ যেন এ ধরনের অনুষ্ঠান বানচাল বা অরাজকতা তৈরি করতে না পারে সেদিকে দৃষ্টি রাখা হবে। পদ্মা সেতু উদ্বোধন ঘিরে আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পক্ষ থেকেও দলীয় নেতাকর্মীদের জন্য সতর্কবার্তা পৌঁছে দেয়া হয়েছে। পাশাপাশি নানা ধরনের নির্দেশনাও দেয়া হয়েছে। ৮ই জুন দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন জেলার দলীয় নেতৃবৃন্দ এবং জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে মতবিনিময়ের সময় প্রধানমন্ত্রীর এ নির্দেশনার কথা জানান আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মির্জা আজম।
প্রধানমন্ত্রীর বার্তা অনুষ্ঠানে পড়ে শুনিয়ে মির্জা আজম বলেন, প্রধানমন্ত্রী আপনাদের শোনাতে একটি মেসেজ দিয়েছেন। আমি পড়ে শোনাচ্ছি। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, সবাই যেন সাবধানে চলাফেরা করে। গাড়ি যেন ওভারটেক না করে। ভলান্টিয়ার সক্রিয় থাকবে। ষড়যন্ত্র তো আছেই। কোনো দুর্ঘটনা আনন্দ মাটি করে দিতে পারে। সাবধানে থাকতে হবে। একই অনুষ্ঠানে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেন, অনেক ঘটনা ঘটছে। পদ্মা সেতুর উদ্বোধনকে সামনে রেখে অনেকে ষড়যন্ত্র করছে। এমনকি উদ্বোধনের দিন একটা ঘটনা ঘটানোর জন্য অনেকে কিন্তু মরিয়া হয়ে চেষ্টা করছে। সবাইকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়ে ওবায়দুল কাদের বলেন, সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে। যাতে শত্রু ভেতরে ঢুকে কোনো ধরনের অন্তর্ঘাত করতে না পারে।
এই কথাটা বলার জন্য বিশেষ করে আমি আপনাদের সামনে এসেছি। সবাই সেদিন সুশৃঙ্খল পরিবেশ বজায় রাখবেন। এদিকে ৮ই জুন সংসদে পদ্মা সেতু নিয়ে আলোচনায় আওয়ামী লীগ দলীয় এমপিরা একই শঙ্কার কথা জানান। তারা বলেন, পদ্মা সেতু উদ্বোধন ঘিরে নানা ধরনের ষড়যন্ত্র চলছে। আওয়ামী লীগ সরকারের অর্জনকে তারা কালিমালিপ্ত করতে চায় কিন্তু সে সুযোগ তারা পাবে না। দেশের মানুষ তাদের সব ধরনের ষড়যন্ত্র সাহসের সঙ্গে মোকাবিলা করবে। ওই আলোচনায় প্রধানমন্ত্রীসহ মোট ৩৮ জন সংসদ সদস্য বক্তব্য দেন। বিকাল পাঁচটার কিছু সময় পর আলোচনা শুরু হয়। মধ্যে মাগরিবের নামাজের জন্য ২০ মিনিটের বিরতি ছিল।
আলোচনা শেষ হয় রাত সাড়ে ১১টায়। আওয়ামী লীগ নেতারা জানান, পদ্মা সেতুতে উজ্জীবিত দল। তৃণমূল পর্যন্ত নেতাকর্মী-সমর্থকদের মধ্যে সেতু উদ্বোধনকে ঘিরে প্রাণের উচ্ছ্বাস, উৎসাহ-উদ্দীপনার ছোঁয়া। এই সেতু হওয়ায় ভোটের মাঠেও আওয়ামী লীগের প্রতি জনগণের সাড়া মিলবে। তারা বলেন, শুধু উদ্বোধনের দিন বর্ণাঢ্য আয়োজন করেই থেমে যাওয়া হবে না। পরে দলের নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণায়ও পদ্মা সেতুকে প্রাধান্য দেয়া হবে। সভা-সমাবেশ, বক্তৃতা-বিবৃতিতে সারা দেশের মানুষের কাছে দেশের উন্নয়ন-অগ্রগতিতে এর প্রভাবকে তুলে ধরা হবে। সবমিলিয়ে ভোটের মাঠে পদ্মা সেতুর প্রভাবকে কাজে লাগাতে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখা হবে।
পদ্মা নদীর বুকে নিজস্ব অর্থায়নে ৩০ হাজার কোটি টাকায় ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ এই সেতুর কাজ ২০১৫ সালের ডিসেম্বরে উদ্বোধন করেছিলেন শেখ হাসিনা। এরপর ২০১৭ সালের ৩০শে সেপ্টেম্বর ৩৭ ও ৩৮ নম্বর খুঁটিতে বসে প্রথম স্প্যান। মাঝে ২২টি খুঁটির নিচে নরম মাটি পাওয়া গেলে নকশা সংশোধনের প্রয়োজন হয়। তাতে বাড়তি সময় লেগে যায় প্রায় এক বছর। করোনাভাইরাস মহামারি আর বন্যার মধ্যে কাজের গতি কমে যায়। সব বাধা পেরিয়ে অক্টোবরে বসানো হয় ৩২তম স্প্যান। এরপর বাকি স্প্যানগুলো বসানো হয়ে যায় অল্প সময়ের মধ্যেই। ঠিক পাঁচ বছরের মাথায় পূর্ণ আকৃতি পায় স্বপ্নের সেতু, যুক্ত হয় পদ্মার দুই পাড়।

