শিশুখাদ্যের দামেও ‘আগুন’, পুষ্টিহীনতার শঙ্কা!

আরো পড়ুন

জাগো বাংলাদেশ ডেস্ক: দিন দিন বেড়েই চলছে নিত্যপণ্যের দাম। চাল, ডাল ও তেল থেকে শুরু করে সবকিছুরই দাম ঊর্ধ্বমুখী। বৈশ্বিক সংকটের অজুহাতে আমদানি পণ্যের দাম হু হু করে বাড়ছে। সব কিছুর দামে মানুষ যখন দিশেহারা তখন পাল্লা দিয়ে বাড়ছে শিশুখাদ্যের দামও। ফর্মুলা দুধ, নুডুলস, সুজি, বিস্কিট, চকলেট থেকে শুরু করে সবকিছুর দাম বেড়েছে প্রায় ২০ থেকে ৩০ শতাংশ। বিশ্লেষকরা বলছেন— শিশুখাদ্যের বিষয়টা অনেক সেনসেটিভ। তাই সরকার অনেক পণ্যের শুল্কমুক্ত ও নামমাত্র শুল্ক নির্ধারণ করে দিয়েছে। এরপরেও যদি দামবৃদ্ধির কারণে শিশুরা ঠিক মতো খাবার না পায় তবে পুষ্টিহীনতার আশঙ্কা রয়েছে।

রাজধানীর বিভিন্ন দোকান, সুপারশপ ও বাজার ঘুরে দেখা গেছে, শিশুদের বহুল প্রচলিত কয়েকটি ফর্মুলা দুধের মধ্যে নেসলে কোম্পানির ল্যাকটোজেনের ৪০০ গ্রামের টিনের কৌটার মূল্য এক বছর আগে ৪৫০ থেকে ৪৭০ টাকা থাকলেও এখন তা বেড়ে খুচরা পর্যায়ে বিক্রি হচ্ছে ৬৫০ থেকে ৬৭০ টাকায়। একই কোম্পানির নান দুধের মূল্য ছিল ৭০০ টাকা, এখন বেড়ে হয়েছে ৯০০ থেকে ৯২৫ টাকা। বায়োমিল ৪০০ গ্রামের টিনের কৌটার দাম এক বছর আগে ছিল ৫৫০ থেকে ৫৬০ টাকা। এখন সেই কৌটার দাম হয়েছে ৬৩০ টাকা। এক বছর আগে ৪০০ গ্রামের ‘প্রাইমা’ দুধের টিনের কৌটা ছিল ৪৫০ টাকা। বর্তমানে তা বিক্রি হচ্ছে ৬২০ টাকায়। এ ধরনের প্রায় প্রতিটি দুধের কৌটা বা প্যাকেটের দাম বেড়েছে ২০ থেকে ৩০ শতাংশ।

বিক্রেতারা বলছেন, এসব পণ্য বেশিরভাগ বাইরের দেশ থেকে আমদানি করা হয়। শিপিং খরচ, বৈশ্বিক সংকট দেখিয়ে কোম্পানিগুলো দাম বাড়িয়ে দিচ্ছে। চাহিদা অনুযায়ী পণ্যগুলো পাওয়াও যাচ্ছে না। তারা দাম বাড়ালে আমাদের কিছু করার থাকে না।

রাজধানী মুগদা এলাকার নাজিয়া ফার্মেসির এক সেলসম্যান বলেন, ‘কয়েক মাস ধরে ঠিকমতো প্রোডাক্ট পাওয়া যাচ্ছে না। আমাদের দোকানে শিশুদের জন্য বায়োমিল-২ খুব চলে। কিন্তু সেটা সাপ্লাই নেই। পেলেও স্বল্প সংখ্যক পাই। এই ধরনের অধিকাংশ পণ্যের একই অবস্থা।’

আরেক দোকানদার বলেন, ‘প্রত্যেকটা জিনিসেরই দাম বেড়েছে। আগে দাম কম ছিল, আমাদের লাভও বেশি ছিল। গায়ের মূল্য থেকে কম দামে দিতে পারতাম। এখন বাড়তি দামের পরও চাহিদা মতো পণ্য পাচ্ছি না। আমি দুধের কৌটার অর্ডার দিয়েছি ১০০টা সেখানে আমাকে সাপ্লাই দিচ্ছে মাত্র ৩০ থেকে ৪০টা। ক্রেতাদের চাহিদা মতো পণ্য দিতে পারছি না।’

এসব পন্যের দাম আরও বাড়তে পারে বলে জানিয়েছেন বিক্রেতারা। শিশু খাদ্যের এমন দামবৃদ্ধিতে ক্ষুব্ধ ক্রেতারাও। দোকানে বাচ্চার জন্য দুধ কিনতে আসা জাহিদ বলেন, ‘সব কিছুরই দাম বেড়েছে। আমরা না হয় দু-একবেলা না খেয়ে থাকতে পারি। বাচ্চাদেরকে তো আর কষ্ট দিতে পারি না।’

একই দোকানে দুধ কিনতে আসা আরেক ক্রেতা বলেন, ‘ছয় মাস আগে যে দুধ ৫৫০ টাকা দিয়ে কিনতাম এখন সেই দুধ কিনতে হচ্ছে ৫০ থেকে ৬০ টাকা বেশি দিয়ে। সব কিছুরই দাম বাড়ে শুধু আমাদের বেতনই বাড়ে না।’

এদিকে ডানো ২৫০ গ্রামের প্যাকেট বিক্রি হচ্ছে ৩৬০ টাকায়। এই দুধ এক বছরে প্রতি প্যাকেটে বেড়েছে প্রায় ৩০ টাকা। নিডো ৭০০ গ্রামের কৌটা বিক্রি হচ্ছে ৫৬০ টাকায়, যা তিন মাস আগে বিক্রি হয়েছে ৫৪০ টাকায়। ২০০ গ্রামের কাগজের প্যাকেটের কমপ্ল্যান বিক্রি হচ্ছে ২৫০ টাকা। কমপ্ল্যান ৩৫০ গ্রামের চকোলেট ফ্লেবারের বর্তমান বাজার মূল্য ৩৪০ থেকে ৩৬০ টাকা। একই সঙ্গে বেড়েছে নুডুলস ও সুজির দাম। বহুল প্রচলিত নুডুলসের মধ্যে ম্যাগি ও মি নুডুলসের এক বছর আগে যে প্যাকেটের দাম ছিল ১২০ টাকা সেটা এখন বিক্রি হচ্ছে ১৪৫ টাকায়। মান ভেদে কেজি প্রতি ২০ থেকে ৩০ টাকা দাম বেড়েছে সুজিরও।

কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) ভাইস প্রেসিডেন্ট এস এম নাজের হোসাইন বলেন, ‘বৈশ্বিকভাবে একটা সংকট চলছে, এটা ঠিক। সব কিছুতে এর প্রভাব এত তাড়াতাড়ি পড়ার কথা না। ব্যবসায়ীরা অনেক জিনিসের দাম সিন্ডিকেট করে বাড়িয়েছে। অনেক জিনিস আগে থেকেই দেশে স্টক রয়েছে। তার পরেও সেগুলো বাড়তি দামে বিক্রি করা হচ্ছে।’

এস এম নাজের হোসাইন বলেন, ‘শিশুখাদ্যের বিষয়টা তো অনেক সেনসেটিভ। এজন্য শিশুদের অনেক প্রোডাক্ট তো শুল্কমুক্ত ও নামমাত্র শুল্ক করে দিয়েছে সরকার। তারপরেও ব্যবসায়ীরা দাম বাড়াতে ব্যস্ত। পত্র-পত্রিকায় দেখা যায়, মানুষ বাজারে কম যাচ্ছে। কম কম করে বাজার করছে। অনেক হিসেব করে খাচ্ছে। এখন শিশুরা তো আর এভাবে কষ্ট করতে পারে না। শিশুখাদ্যের দাম বাড়তে থাকলে শিশুদের স্বাস্থের ওপর প্রভাব পরবে। তারা ঠিকমতো খাবার না পেলে পুষ্টিহীনতায় ভুগতে পারে। যা দেশের মানুষের জন্য অনেক বড় ক্ষতি। এই দিকে সরকারের বিশেষ নজর দেওয়া উচিত।’

সাধারণ নাগরিক সমাজের সভাপতি মহিউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘ব্যবসায়ীরা সবসময় দাম বাড়ানোর টার্গেটে থাকে। একটু সুযোগ পেলেই প্রথমে কৃত্রিমভাবে সংকট দেখায়, তারপর সিন্ডিকেট করে দাম বাড়িয়ে দেয়। কিছু ব্যবসায়ী ও প্রতিষ্ঠান দিন দিন এতটাই অসাধু হয়ে উঠেছে যে শিশুদের ক্ষুধা মেটানোর খাবারটাকেও তারা ছাড়ছে না। সংকট দেখিয়ে সেগুলোরও দাম বাড়ায়। যুদ্ধ রাশিয়া-ইউক্রেনে চললেও ব্যবসায়ীরা বিষয়টিকে এমনভাবে উপস্থাপন করছে মনে হয় যুদ্ধ বাংলাদেশেই শুরু হয়েছে। সরকারকে বলবো- এগুলো যেন কঠোরভাবে দমন করা হয়। না হলে দেশে দীর্ঘমেয়াদি এর প্রভাব পড়তে পারে।’

জাগো/এমআই

আরো পড়ুন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

সর্বশেষ