নিজস্ব প্রতিবেদক: যশোর পৌরসভার পার্কের পুকুরে চলছে মাছ শিকারীদের রাম রাজত্ব। কোনো নিয়মই তারা মানেন না। এ পুকুরে মাছ ধরতে একটি টিকিটে ৩টি হুইল ছিপের নির্দেশনা থাকলেও তা কেউই মানছেন না। একজন মাছ শিকারী ১৫ থেকে ২৫টা হুইল ছিপ দিয়ে মাছ ধরছেন। আবার এক দিনের টিকিট কেটে পাঁচ দিন ধরে চলছে মাছ শিকার। কেউ কেউ ফ্রি পাসেও ধরছেন মাছ। ফলে অবৈধপন্থায় প্রতিদিনই তিন থেকে পাঁচমণ পর্যন্ত মাছ ধরা হলেও পৌরসভার ফান্ডে জমা পড়ছে নামমাত্র টাকা। এ যেন রামরাজত্ব।
পুকুরে মাছ ধরার নামে শিকারীদের এমন যথেচ্ছাচারের ঘটনা স্বীকারও করেছেন শিকারীরা। বলছেন, পুকুরে এখন মাছ কম। তাই তারা একটু এদিক-ওদিক করছেন।
জানা গেছে, সপ্তাহে সাতদিন যশোর পৌর পার্কের দুটি পুকুরে মাছ শিকারের জন্য টিকিট বিক্রি করে যশোর পৌরসভা। যশোরসহ জেলার বাইরের অনেক সৌখিন মৎস্য শিকারী এই পুকুরে মাছ ধরার জন্য টিকিট ক্রয় করেন। ২৪ ঘন্টা মেয়াদের প্রতি টিকিটের মূল্য দুই হাজার টাকা। প্রতি টিকিটে একজন সৌখিন মৎস্য শিকারী তিনটি ছিপ ফেলাতে পারবেন। তবে তিনদিন ধরে সরেজমিনে দেখা যায়, একটি টিকিটের বিপরীতে ১৫ থেকে ২৫টি পর্যন্ত হুইল ছিপ দিয়ে মাছ ধরছেন শিকারীরা। আবার কেউ একদিনের অনুমতি নিয়ে তিন থেকে এক সপ্তাহ পর্যন্ত মাছ শিকার করছেন বলে জানা গেছে।
এদিকে পৌরসভার মেয়রের পরিবারের ঘনিষ্ট লোকেরা বিনাটিকিটে মাছ শিকার করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। আবার অনেকেই পৌর মেয়র বা কাউন্সিলরদের কাছ থেকে ভিআইপি পাস নিয়ে তা কম মূল্যে শিকারীদের কাছে বিক্রি করেছেন বলেও অভিযোগ করেছেন একাধিক মৎস্য শিকারী।
বুধবার(১৮মে) পৌর পার্কের পুকুরে মাছ শিকার করতে আসেন শহরের গোলাম কাউসার তোতা। তিনি দুই হাজার টাকা দিয়ে একটি পাস নিয়ে ৪টি ছিপ ফেলেছেন পুকুরে। তিনি জানান, অবসর সময়ে পৌর পার্কে মাছ শিকার করতে আসি। তবে পুকুরে এখন আর মাছ শিকার হয়না। মনে হয় মাছ হরিলুট হয়। তাই এখন আর মাছ শিকার করতে আসি না। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আগের মেয়রের সময়ে পুকুরে মাছ শিকারের নিয়ম-শৃঙ্খলা ছিল। আগে মাসে একবার হতো। এখন হচ্ছে সারামাস। যে যেমন পারছে পাস নিচ্ছে। কেউ ভিআইপি টিকিট নিয়ে আবার কেউ টিকিট না নিয়ে মাছ মারছে। তারা মাছ শিকার করতে এসে ভুলে যান, এটা সৌখিনতা, প্রফেশনাল না। এক টিকিটের বিপরীতে ১৫-২০ টা পর্যন্ত ছিপ ফেলা হচ্ছে পুকুরে। তাই জায়গার অভাবে অনেকেই মাছ শিকার করা বাদ দিয়ে দিয়েছেন। আবার অনেকেই একদিনের টিকিটেই ৫/৬ দিন মাছ শিকার করছে। মাছ শিকারের খরচ উঠাতে প্রতিদিনই টিকিট দেয়া ‘অপকৌশল’ করে অবৈধভাবে মাছ শিকার করছেন।
পালবাড়ি এলাকার সালাম হোসেন নামে এক সৌখিন মৎস্য শিকারী পৌর পুকুরে ছিপ ফেলেছেন ১ টিকিটে ১২টি । তার কাছে মাছ শিকারের পাস দেখতে চাইলে তিনি উত্তেজিত হয়ে বলেন, কোন টিকিট নেই। তিনদিন ধরে মাছ ধরা এই শিকারী পরে অবশ্য একদিনের টিকিট দেখাতে পেরেছিলেন। তিনি বলেন, এখন আর পুকুরে মাছ নেই।
মঙ্গলবার (১৭ মে) মাছ ধরছিলেন জেলা সৌখিন মৎস্য শিকারী সমিতির সভাপতি শওকত হোসেন। তিনি গত সাতদিন ধরে ১২টা ছিপ দিয়ে মাছ ধরার কথা জানালেও তিনি টিকিট দেখাতে পেরেছেন মাত্র এক দিনের। তিনি বলেন, মাছ হচ্ছে না। আর কোন ভিড় নেই বলে এতগুলো ছিপ ফেলেছি। এখন আর পুকুরে মাছ নেই। অনেকেই টাকা খরচ করে টিকিট কেটে মাছ না পেয়ে খালি হাতে ফিরে যাচ্ছেন। তবে টিকিট কেটে পকুরে মাছ শিকার করেন দাবি করে তিনি বলেন, আগে অনেক লোক আসতো এখন আসেনা, মাছ শিকারের জন্য জিনিসপত্রের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে কয়েকগুণ অনেকেই চার ও মাছ ধরার জিনিসপত্রের দাম তুলতে বেশি করে ছিপ ফেলছেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক মৎস্য শিকারী বলেন, যশোর পৌরসভার মেয়রের আত্মীয় স্বজন, জেলা পুলিশ প্রশাসনের নাম ব্যবহার করে এখানে ভিআইপি পাস নিয়ে মাহ শিকার চলছে। উন্নত মানের চার ব্যবহার করে তারা অনেক বেশি মাছ মেরে যাচ্ছে। অথচ পৌরসভা প্রায় দুই বছর কোন মাছ ছাড়েনি। অবৈধভাবে বিনাটিকিটে মাছ শিকারের নামে পৌরসভার এই পুকুরগুলো থেকে মাছ লুট করছে কথিত ওইসব সৌখিন মৎস্য শিকারীরা । তিনি এইগুলো বন্ধ করে নিয়ম শৃংঙ্খলা কঠোর করে মাছ শিকারের অনুমতি দেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছেন ।
এ বিষয়ে পৌরসভার হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা রবীন্দ্র নাথ রাহা বলেন, আগে প্রতিমাসে বিজ্ঞপ্তি দিয়ে মাছ শিকারের অনুমতি দেওয়া হতো। এখন গত তিনমাস ধরে প্রত্যেক দিন মাছ শিকারের অনুমতি দেওয়া হয়। দুই হাজার টাকার টিকিটে একজন শিকারী তিনটা ছিপ ফেলানোর নিয়ম থাকলেও অনেকেই তার কয়েকগুণ বেশি ফেলছে। যারা তদারকি করেন তারা হাল ছেড়ে দেওয়ার কারণে এমনটি হচ্ছে বলে জানান তিনি।
পৌরসভার পুকুরের দায়িত্বে থাকা হান্নান হোসেন বলেন, আগে সার্কুলার দিয়ে মাছ শিকারের অনুমতি দেওয়া হতো। অনেক দেরি কারে সার্কুলার দেওয়ার ফলে অনেকেই বিনাটিকিটে মাছ নিয়ে যেত। তাই বর্তমান মেয়র টিকিটের দাম কমিয়ে প্রত্যেকদিন মাছ ধরার নিয়ম করে দিয়েছেন।
গত মেয়রের সময়ে মাছ ছাড়া হলেও এখন পর্যন্ত কোন মাছ ছাড়া হয়নি পুকুরে। এ বিষয়ে যশোর পৌরসভার মেয়র মুক্তিযোদ্ধা হায়দার গণী খান পলাশ ও সচিব আজমল হোসেনের সাথে ফোনে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলে তারা কেউ ফোন রিসিভ করেননি।
জাগো/এমআই

