অনিয়মে ভরা বগুড়া সিভিল সার্জন অফিস, অবৈধ ক্লিনিকে ঠাসা অলিগলি

আরো পড়ুন

জেলা প্রতিনিধি, বগুড়া: বগুড়ায় সিভিল সার্জন কার্যালয় অনিয়মের আখড়ায় পরিণত হয়েছে বলে বলে অভিযোগ উঠেছে। তদারকি নেই লাইসেন্সবিহীন ক্লিনিক, হাসপাতাল ও ডায়গনস্টিক সেন্টারে। এদিকে এসব সেবা প্রতিষ্ঠান চালাতে নাকি পূরণ করতে হয় নানা চাহিদা। রয়েছে রাজনৈতিক প্রভাব ও অবৈধ আর্থিক লেনদেনের অভিযোগও।

অন্যদিকে প্রশিক্ষিত নার্স, যোগ্য টেকনেশিয়ান ও প্রয়োজনীয় সংখ্যক চিকিৎসক ছাড়াই শহরজুড়ে রমরমা অবৈধ ক্লিনিক ব্যবসা। অবৈধ ব্যবসাকে চাঙ্গা করতে অনিয়মের তথ্য লুকিয়ে একটি ক্লিনিক উদ্বোধনের সময় প্রধান অতিথি হিসেবে আনা হয় একজন সংসদ সদস্যকেও। এদিকে এসব বিষয়ে অনুসন্ধানে নামলে জাগো বাংলাদেশের সামনে মুখ খুলতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন সরকারি কর্মকর্তাদের অনেকেই। নাম মাত্র অভিযান চালিয়ে সিলগালা করা হলেও ২ দিন পরে আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে আবার চালু হয়ে যায় প্রতিষ্ঠানগুলো। ব্যবহার করা হয় মেয়াদোত্তীর্ণ ঔষধ। বগুড়া সদরসহ আদমদীঘি, দুপচাঁচিয়া, নন্দীগ্রাম, শাজাহানপুর ঘুরে পাওয়া গেছে এসব তথ্য।

বগুড়া সিভিল সার্জন কার্যালয়ের দেয়া তথ্যমতে, বগুড়া পৌরসভাসহ সদর উপজেলায় বগুড়া নার্সিং হোম, রাবেয়া নার্সিং হোম, শামছুন্নাহার ক্লিনিক অ্যান্ড ডায়গোনস্টিক সেন্টার, ল্যাব এইড লিমিটেড (ডায়গনস্টিক সেন্টার), ইবনে সিনা ডায়গনস্টিক সেন্টার অ্যান্ড কনসালটেশন সেন্টার, শামছুন্নাহার ক্লিনিক অ্যান্ড ডায়গোনস্টিক সেন্টার, পপুলার ডায়গনস্টিক সেন্টার, টিএমএসএস মেডিকেল কলেজ ও রফাতুল্লাহ কমিউনিটি হাসপাতাল, গাক চক্ষু হাসপাতাল, রেইনবো কমিউনিটি হাসপাতাল, ইন্ডিপেন্ডেন্ট জেনারেল হাসপাতাল, ডক্টরস ক্লিনিকসহ ৯৭টি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স রয়েছে। অবৈধভাবে স্বাস্থ্য খাতে পরিচালিত হচ্ছে প্রায় একশোরো অধিক প্রতিষ্ঠান।

জানা যায়, আদমদীঘি উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. শহীদুল্লাহ দেওয়ানের অধীন এলাকা এখনো অবৈধ স্বাস্থ্যসেবামুক্ত। তবে কাহালু উপজেলায় চলছে নামসর্বস্ব দুটি ক্লিনিক ও ডায়গনস্টিক সেন্টার। দুপচাঁচিয়া উপজেলায় কমপক্ষে ১৫টি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে চলছে অবৈধ উপায়ে প্রভাব খাটিয়ে। নন্দীগ্রাম উপজেলায় অনুমোদন ছাড়াই চলছে নন্দীগ্রাম মডেল ক্লিনিক, ফাতেমা ক্লিনিক অ্যান্ড ডায়গনস্টিক সেন্টার, রোকেয়া জেনারেল হসপিটালসহ কমপক্ষে আটটি প্রতিষ্ঠান। শাজাহানপুর উপজেলায় ব্যাঙের ছাতার মতো স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান গজিয়ে উঠলেও লাইসেন্স নেই প্রফেসর ক্লিনিক অ্যান্ড ডায়গোনস্টিক সেন্টার, ম্যাক্স কেয়ার ক্লিনিক অ্যান্ড ডায়গনস্টিক সেন্টার, আনোয়ারা ক্লিনিক অ্যান্ড ডায়গনস্টিক সেন্টার ও গ্রামীণ জিসি চক্ষু হাসপাতাল।

ফাতেমা ক্লিনিক অ্যান্ড ডায়গোনস্টিক সেন্টারের ম্যানেজার আইয়ুব আলী বলেন, প্রায় ১০ বছর আগে ক্লিনিকটি চালু করা হলেও লাইসেন্স পাওয়া যায়নি। লাইসেন্সের জন্য ৮৫ হাজার টাকা খরচ করলেও এখন পর্যন্ত তা পাওয়া যায়নি। প্রায় একই রকম কথা বলেন হেলথ কেয়ার ক্লিনিক অ্যান্ড ডায়গোনস্টিক সেন্টারের পরিচালক এম এ মাসুদ জানান, সব ধরনের আইন ও বিধি মেনে প্রায় তিন বছর ধরে সরকারের ঘরে টাকা জমা করলেও সিভিল সার্জন কার্যালয়ে অতিরিক্ত টাকা না দেয়ায় এখনো লাইসেন্স প্রদান করছেন না।

দেখা গেছে, প্রয়োজনীয় নার্স ও প্রশিক্ষিত ওয়ার্ড বয়, প্যাথলজিস্ট ও রোগী অপারেশনের উপযুক্ত পরিবেশ ছাড়াই স্বাস্থ্য বিভাগের নাকের ডগায় পরিচালিত হচ্ছে এসব প্রতিষ্ঠান। মিলছে না কাক্ষিত স্বাস্থ্যসেবা, নিশ্চিত করা হয়নি রোগীর তথ্য অধিকার। কিছু উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সদিচ্ছা থাকলেও স্বাস্থ্য বিভাগ আগ্রহী না হওয়ায় কঠোর কোনো পদক্ষেপ নিতে রাজি নয় তারা।

মানবাধিকার কর্মী অ্যাডভোকেট সদরুল আনাম রঞ্জু এবং সুশাসনের জন্য প্র্রচারাভিযান (সুপ্র) সাধারণ সম্পাদক কে জি এম ফারুক বলেন, স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানগুলোকে কার্যকরী করতে সরকারের আরো বেশি সদিচ্ছার প্রয়োজন।

বগুড়া-৫ আসনের সংসদ সদস্য হাবিবর রহমান বলেন, ক্লিনিক কর্তৃপক্ষ তাকে ভুল বুঝিয়ে ব্যবহার করে অবৈধ লাইসেন্সবিহীন ক্লিনিক উদ্বোধন করিয়ে নিয়েছে। লাইসেন্সবিহীন ক্লিনিক বন্ধ করার পক্ষে মত দেন তিনিও।

এসব বিষয়ে বগুড়া সদর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. সামির হোসেন মিশু এবং সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আজিজুর রহমান, শাজাহানপুর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মোতারব হোসেন এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাহমুদা পারভীন মন্তব্য না করলেও নন্দীগ্রাম উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. তোফাজ্জল হোসেন এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শারমিন আখতার জানান, পরিদর্শনপূর্বক স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।

বগুড়া সিভিল সার্জন ডা. গওসুল আজিম চৌধুরীর কাছে এসব বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে তিনি কার্যালয়ে ‘অবৈধ লেনদেনের’ বিষয় অস্বীকার করে বলেন, লাইসেন্সধারীরাই স্বাস্থ্যসেবা দিতে পারবে। অন্যদের বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।

কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়না। জিম্মি স্বাস্থ্যখাত যেনো যাচ্ছেতাই ভাবেই চলছে। গ্রামের অসহায় গবীর খেটে খাওয়া মানুষকে টার্গেট করে দেদারসে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে এসব ক্লিনিক। এদের আবার কমিশনের ভিত্তিতে বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালে নিয়োগ দেয়া আছে দালাল। যার সাথে জড়িত আছে সরকারি ওয়ার্ড বয়, আয়া থেকে শুরু করে ভূয়া পল্লী চিকিৎসকরাও।

এসব ক্লিনিকে এসে প্রতারণার শিকার অনেকেই, কিন্তু অভিযোগ জানালেও হয়না কোনো প্রতিকার। বগুড়াবাসীর এখন একটাই দাবি বন্ধ হোক চিকিৎসার নামে বাণিজ্য ও অপচিকিৎসা।

আরো পড়ুন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

সর্বশেষ