মণিরামপুর থেকে ফিরে, মুনতাসির আল ইমরান: ৫৫ বছর সংসার জীবনে স্বারথি দেবির প্রথম আবদার ছিলো ঘুরতে নিয়ে যাওয়ার। এমন কথা শুনে কিছুটা অবাক হন কর্তা অমেশ দত্ত। দেবির চাওয়া পূর্ণ করতে মেয়ে, বউমা, নাতি-পুতি সাথে নিয়ে ঘুরতে আসেন। যশোরের মণিরামপুর উপজেলার ঝাঁপা বাওড়রে ভাসমান সেতুটি দেখছেন অপলোক দৃষ্টিতে তারা।
খুলনা চুকনগর থেকে ঘুরতে আসা স্বারথি দেবি (৭০) বলেন, বাড়ির মেয়ে বউরা একদিন বলে পানির ওপরে ভাসা সেতুর কথা। তখন আমার ইচ্ছা জাগে পানির ওপরে কি ভাবে সেতু ভেসে থাকে দেখার। কর্তারে বললে মেয়ে, বউমা, নাতি-পুতি সাথে নিয়ে সেতু দেখতে আসা।
অমেশ দত্ত বলেন, বাড়ির গিন্নির প্রথম ঘুরতে আসার চাওয়া পূর্ণ করতে এখানে আসা। পানির ওপরে সেতু দেখে তো অবাক হয়ছি। এমন সেতু আগে কখন দেখিনি। ভালো লাগছে শেষ বয়সে এসে গিন্নির ইচ্ছা পূর্ণ করতে পেরে।
পানির ওপরে ভাসছে হাজার ফুটের বেশি লম্বা সেতুটি। ১৪৮ ব্যক্তি মিলে নিজেদের টাকায় ১২৩৮ পিচ প্লাস্টিকের ড্রাম, লোহার অ্যাঙ্গেল ও শিট দিয়ে এই সেতু নির্মাণ করা হয়। নীল ও লাল রঙের দৃষ্টিনন্দন সেতুটি দেখতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসে দর্শনার্থীরা। সেতুর উপরে হাঁটছেন, ঘুরছেন। প্রতিদিন প্রচুর মানুষ ভিড় করছে সেতুটিতে। সেতুটি যশোরের মণিরামপুর উপজেলার রাজগঞ্জ এলাকায় ঝাঁপা বাওরে অবস্থিত। সেতুটির নামকরণ করা হয়েছে ‘বঙ্গবন্ধু ভাসমান সেতু’।
এদিকে আগত দর্শকদের কেন্দ্র করে বাওড় পাড়ে গড়ে উঠেছে মোটরসাইকেল, গাড়ি পার্কিং এলাকা, নাগরদোলা, খাবারে দোকান, চটপটি-ফুচকা, বাচ্চাদের খেলনা ও ফুলের দোকান। মনোরম পরিবেশের ঝাঁপা বাওড় ঘুরতে ট্রলার ও নৌকার ব্যবস্থা আছে।
যশোর সরকারি এমএম কলেজের ব্যবসা বিভাগের ছাত্র তুষার ইমরান বলেন, বন্ধুদের সাথে ঘুরতে আসা হয় মাঝে মাঝে। অনেক নিরিবিলি ও শান্ত পরিবেশ। প্রকৃতি এতোটা কাছ থেকে দেখতে ভালোই লাগে।
ছয় বছরে মেয়ে রাইসি তাসনুমকে নিয়ে ঘুরতে আসেন যশোর সেনানিবাসের কর্মরত জাহিদ শেখ। তিনি বলেন, ছুটির দিনে বউ ছেলে মেয়েদের একটু বিনোদন দিতে ভাসমান সেতুতে আসা। এখানকার পরিবেশ অনেক ভালো। গ্রামের মধ্যে সুন্দর একটি মনোরম পরিবেশ।
বঙ্গবন্ধু ভাসমান সেতু কমিটির সভাপতি আব্দুল জলিল সরদার বলেন, ২০১৬ সালে ১৪৮ ব্যক্তি মিলে এই ভাসমান সেতুটি নির্মাণ করেছি। ২০১৭ সালের আগস্ট মাস হতে ৯টি গ্রামের মানুষ সহজে যাতায়েত করতে পারছে সেতুটি দিয়ে। শুধু যাতায়াত নয়, সেতু ঘিরে মানুষের উর্পাজন বেড়েছে। তাছাড়া বিনোদন কেন্দ্র হিসেবে ইতিমধ্যে পরিচিতি লাভ করেছে দেশজুড়ে।
তিনি আরো বলেন, প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা ভাসমান সেতুকে ঘিরে যেন জনস্রোত নামে। শুক্র ও শনিবারসহ ঈদের পরে দিনগুলোতে প্রতিদিন অন্তত ২০ হাজার নারী-পুরুষ, শিশু-কিশোরের পদচারনায় মুখরিত থাকে গোটা এলাকা।
মণিরামপুর ঝাঁপা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান শামছুল হক মন্টু বলেন, ভাসমান সেতুর পাশাপাশি এই জনপদের জন্য স্থায়ী একটা সেতুর দরকার। সেতুর জন্য আমরা এলাকাবাসীরা ওপর মহলে আমরা কথা বলেছি। তারা আশ্বাস দিয়েছেন।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, দীর্ঘ এই বাওড়ের ধারে সরকারি কিংবা কোন সংস্থার মাধ্যমে দর্শকদের বসার স্থান, পিকনিক স্পট ও অন্যান্য অবকাঠামোগত উন্নয়ন করা গেলে গোটা এলাকাটি পূর্ণাঙ্গ পর্যটক এলাকায় রূপ নেবে।
যশোরের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক রফিকুল হাসান বলেন, মণিরামপুরে ঝাঁপা ভাওড় ভাসমান সেতু ঘিরে অনেক মানুষ জীবন জীবিকা চলছে। এখানে প্রতিদিন প্রচুর মানুষ আছেন ঘুরতে। শুধু বিনোদনী নয়, দুই পাড়ের মানুষের যাতায়েতের সুব্যবস্থা হয়েছে সেতুটির মাধ্যমে।
জাগো/ডিপি

