দেশে সারের দাম কেজিতে বেড়েছে ৫ টাকা। এর ফলে দেশে উৎপাদন খরচ বাড়বে কৃষিপণ্যের। আগামী অর্থবছরে কৃষককে চারটি সার কিনতেই বাড়তি গুণতে হবে প্রায় তিন হাজার কোটি টাকা।
চলতি বোরো মৌসুমে এরই মধ্যে বিভিন্ন জায়গায় ধান উঠতে শুরু করেছে। দেশে এখন আর কোথাও বোরো ধান উৎপাদনে সেই অর্থে সারের ব্যবহার হবে না। তবে সারের দাম বৃদ্ধির কারণে বোরো মৌসুমের ধান উঠার সঙ্গে সঙ্গে দাম বাড়ার শঙ্কা রয়েছে। তাই আরো ১৫ দিন পরে সারের দাম বাড়ানো যেতো বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সারের দাম বৃদ্ধি প্রসঙ্গে কৃষিমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক সাংবাদিকদের বলেছেন, সরকার এরইমধ্যে সারের দাম বাড়িয়েছে। প্রতিকেজিতে ৫ টাকা করে বাড়িয়েছে। আমরা খুব চেষ্টা করেছি সারের দাম না বাড়াতে। সর্বাত্মক চেষ্টা করা হয়েছে সারের দাম যেন না বাড়ানো হয়। সারের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে আন্তর্জাতিক বাজারে। প্রতেকটি সারের দাম বেড়েছে।
তিনি বলেন, গতবছর সাড়ে ২৮ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিয়েছে, এবার ৪৩ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হবে। এটি সরকার দিতে পারছে না। দিতে কষ্ট হচ্ছে। অর্থনীতিকে বাঁচানোর জন্যই সরকার বাধ্য হয়েছে সারের দাম বাড়াতে। কৃষকরা কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। যে পরিমাণ দাম বেড়েছে তাতে উৎপাদনে খুব একটা প্রভাব পড়বে না।
প্রসঙ্গত ইউরিয়া, টিএসপি, ডিএপি ও এমওপি সারের দাম প্রতি কেজিতে ৫ টাকা বৃদ্ধি করা হয়েছে। কৃষকপর্যায়ে প্রতিকেজি ইউরিয়ার বর্তমান দাম ২২ টাকার পরিবর্তে ২৭ টাকা, ডিএপি ১৬ টাকার পরিবর্তে ২১ টাকা, টিএসপি ২২ টাকার পরিবর্তে ২৭ টাকা এবং এমওপি ১৫ টাকার পরিবর্তে ২০ টাকা পুনঃনির্ধারণ করা হয়েছে।
একইভাবে, ডিলার পর্যায়েও প্রতিকেজি ইউরিয়ার বর্তমান দাম ২০ টাকার পরিবর্তে ২৫ টাকা, ডিএপি ১৪ টাকার পরিবর্তে ১৯ টাকা, টিএসপি ২০ টাকার পরিবর্তে ২৫ টাকা এবং এমওপি ১৩ টাকার পরিবর্তে ১৮ টাকা পুনঃনির্ধারণ করা হয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগের ১০ এপ্রিলের এক চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে কৃষি মন্ত্রণালয় সোমবার (১০ এপ্রিল) সারের মূল্য বৃদ্ধির এই আদেশ জারি করেছে।
এতে বলা হয়, চলমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক বাজারে সারের দাম অস্বাভাবিক বৃদ্ধি পাওয়ায় সারের আমদানি যৌক্তিক পর্যায়ে রাখা এবং সারের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে সারের মূল্য পুনঃনির্ধারণের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে। পুনঃনির্ধারিত এ মূল্য ১০ এপ্রিল থেকেই কার্যকর হয়েছে।
উল্লেখ্য, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিকেজি ইউরিয়া সারের বর্তমান দাম ৪৮ টাকা, ডিএপি ৭০ টাকা, টিএসপি ৫০ টাকা আর এমওপি ৬০ টাকা। এর ফলে ৫ টাকা দাম বৃদ্ধির পরও সরকারকে প্রতিকেজি ইউরিয়াতে ২১ টাকা, ডিএপিতে ৪৯ টাকা, টিএসপিতে ২৩ টাকা এবং এমওপিতে ৪০ টাকা ভর্তুকি প্রদান করতে হবে। বিগত তিন বছর ধরে আন্তর্জাতিক বাজারে সারের দাম প্রায় ৩ থেকে ৪ গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। এর ফলে দেশে সারে প্রদত্ত সরকারের ভর্তুকিও বেড়েছে প্রায় ৪ গুণ।
২০২০-২১ অর্থবছরে যেখানে ভর্তুকিতে লেগেছিল ৭ হাজার ৪২০ কোটি টাকা, সেখানে ২০২১-২২ অর্থবছরে লেগেছে ২৮ হাজার কোটি টাকা, আর চলতি ২০২২-২৩ অর্থবছরে প্রয়োজন হবে প্রায় ৪৬ হাজার কোটি টাকা। সারে ২০০৮-০৯ থেকে ২০২২-২৩ অর্থবছরের এখন পর্যন্ত সর্বমোট এক লাখ ১৯ হাজার ৮৩৭ কোটি টাকা ভর্তুকি প্রদান করা হয়েছে।
হিসাব করে দেখা গেছে, যে চারটি সারের দাম বাড়ানো হয়েছে সেই সারের চাহিদা ধরা হয়েছে প্রায় ৬০ লাখ টন। ফলে আগামী অর্থবছরে শুধু এ চারটি সার কিনতে কৃষককের বাড়তি গুনতে হবে প্রায় তিন হাজার কোটি টাকা।
প্রসঙ্গত, আগামী ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৬৮ লাখ ৪২ হাজার ৫০০ টন সারের চাহিদা নির্ধারণ করেছে সরকার। এরমধ্যে আগামী অর্থবছরে ২৭ লাখ টন ইউরিয়া, ১৬ লাখ টন ডিএপি, সাড়ে ৭ লাখ টন টিএসপি, ৯ লাখ টন এমওপি, ৩০ হাজার টন এমওপি, ৩০ হাজার টন এনপিকেএস, সাড়ে ৫ লাখ টন জিপসাম, এক লাখ ৪০ হাজার টন জিংক সালফেট, ২ হাজার ৫০০ টন অ্যামোনিয়াম সালফেট, ৯০ হাজার টন ম্যাগনেশিয়াম সালফেট এবং ৫০ হাজার টন বোরন প্রয়োজন হবে সম্প্রতি এক ব্রিফিংয়ে জানিয়েছে কৃষিমন্ত্রণালয়।
এই তথ্যে দেখা যাচ্ছে যে, চারটি সারের দাম বাড়ানো হয়েছে তার চাহিদা ৫৯ লাখ ৫০ হাজার টন। সে হিসাবে কৃষককে বাড়তি খরচ করতে হবে প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকা।

