এবার লিতুন জিরা’র পাশে প্রধানমন্ত্রী, পাচ্ছে আর্থিক সহায়তা

আরো পড়ুন

নিজস্ব প্রতিবেদক: হাত পা ছাড়া জন্ম নেওয়া যশোরের সেই শারিরিক প্রতিবন্ধী লিতুন জিরার পাশে দাঁড়িয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তার পড়াশুনা ও চিকিৎসার জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ৫ লাখ টাকা অর্থসহায়তা দিচ্ছেন। ৩ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কার্যালয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা লিতুন জিরাকে আর্থিক সহায়তার চেক প্রদান করবেন।

এর আগে, চলতি মাসের ৩ মার্চ শেখ হাসিনার সাথে দেখা করার ইচ্ছা পোষণ করে চিঠি লিখেন লিতুন জিরা। সেই চিঠি পেয়েই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা লিতুনের খোঁজ খবর নেন। সোমবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কার্যালয়ে প্রবেশের অনুমতি ও ৫ লাখ টাকার অর্থসহায়তা পাওয়ার বিষয়ে একটি চিঠি এসেছে লিতুন জিরার বাড়িতে। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন লিতুন জিরার বাবা হাবিবুর রহমান।

লিতুন জিরা যশোরের মণিরামপুর উপজেলার শেখপাড়া খানপুর গ্রামের হাবিবুর রহমান ও জাহানারা বেগম দম্পতির মেয়ে। দুই ভাইবোনের মধ্যে ছোট লিতুন। লিতুনের বাবা হাবিবুর রহমান ওই উপজেলার শহীদ মুক্তিযোদ্ধা এ আর মহিলা কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের প্রভাষক। তিনি ১৮ বছর ধরে কলেজটিতে শিক্ষকতা করছেন। লিতুনের মা জাহানারা বেগম গৃহিণী।

লিতুন জিরা

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা লিতুন জিরাকে আর্থিক সহায়তা দিচ্ছেন জানতে পেরে খুব খুশি লিতুন জিরা। সে জানায় ‘খবরটি প্রথমে আমার বাবাই প্রথম দিয়েছিল। শুধু আর্থিক সহায়তাই না; একইসাথে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে সরাসরি দেখাও করতে পারবো আমি। আমার যে কত খুশি লাগছে। আমার স্বপ্ন চিকিৎসক হওয়ার। সেই স্বপ্ন পূরণে আমি ও আমার পরিবার সংগ্রাম করে যাচ্ছি। সেই সংগ্রামে আমি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পাশে পেয়েছি। প্রতিবন্ধীদের প্রতি খুবই আন্তরিক এমন একটি প্রধানমন্ত্রী পেয়েছি আমরা।’

লিতুন জিরার বাবা হাবিবুর রহমান বলেন, লিতুন খুবই মেধাবি। ছোট বেলা থেকেই উদ্যমী। কিছু করার প্রতি তার মনের মধ্যে প্রবল আগ্রহ সৃষ্টি হয়। সেই আগ্রহ আর পরিশ্রম সংগ্রামীর মধ্যে দিয়ে সে আজ অনেকপথ এগিয়েছে। ওর হাতের লেখা সুন্দর। ভালো ছবিও আঁকতে পারে। কবিতা আবৃত্তি করতে পারে। গান গাইতে পারে। পড়াশুনার আর পাঁচ-দশটি মেয়ের মতো ভালো। পিএসসিতে জিপিএ-৫ সাথের বৃত্তি লাভ করে। সেই ধারাবাহিকতা আশা করি সে ধরে রাখবে। সেই প্রস্তুতি নিচ্ছে সে। ও যত দূর পড়তে চায়, আমি ওকে তত দূর পড়াব।

তিনি আরও বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাকে পাঁচ লাখ টাকার অনুদান দিবেন বলে একটি চিঠি এসেছে বাড়িতে। একইসাথে বিষয়টি নিশ্চিত করে প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের পিএস আমার সাথে কথা বলেছে। রবিবার সেই চেক লিতুনের কাছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজ হাতে প্রদান করবেন। প্রতিবন্ধীদের প্রতি আন্তরিক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা লিতুনের পাশে দাঁড়ানোই শেখ হাসিনাকে ধন্যবাদ জানান তিনি।

এক প্রশ্নের জবাবে হাবিবুর রহমান বলেন, লিতুনের বর্তমানে প্রচুর খরচ। সে নিজে চলাফেরা করতে পারে না। তাই তার একটি গাড়ির দরকার সবসময়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেওয়া অর্থসহায়তার টাকা তার একটি চলাফেরার জন্য গাড়ি ও তার পড়াশুনার জন্য কিছু টাকা তিনি সঞ্চয় রেখে ভর্বিষ্যতে পড়াশুনার কাজে লাগাতে চান বলে জানান লিতুনের বাবা হাবিবুর রহমান।

লিতুন জিরার পাশে এখন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এগিয়ে আসায় ভীষণ খুশি লিতুন জিরার মা জাহানারা বেগম। লিতুনের কিছুটা সংগ্রামের কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, লিতুনের জন্মের পর তার প্রতিবন্ধিত্ব দেখে অনেক কেঁদেছিলাম। পরে সিদ্ধান্ত নেই, ওকে কারও বোঝা হতে দেব না। সেই পণ থেকে ছোটবেলায় ওকে টুলের সামনে বসিয়ে রাখতাম। টুলের ওপর লেখার স্লেট রেখে হাতে দিতেন খড়িমাটি। খড়িমাটি ডান হাতের বাহুর মাথা দিয়ে ডান চোয়ালে চেপে ধরে নিচু হয়ে মেয়েটা স্লেটে লিখত। এভাবে নিজে নিজেই লেখা শিখেছে। এখন সেভাবে কলম ধরে সামনে টেবিলে রাখা খাতায় লিখে প্রাথমিকের গন্ডি পেরিয়ে এখন সে মাধ্যমিকে। সে এবার জেএসসি পরীক্ষা দিবে। তার প্রস্তুতিও ভালো। এরইমধ্যে জানতে পারলাম প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা লিতুনের জন্য আর্থিক সহায়তা দেবেন। বিষয়টা জানতে পেরে খুবই ভালো লাগছে। তবে লিতুন যত বড় হচ্ছে; তার নিয়ে ততই চিন্তা হচ্ছে আমাদের। পড়াশুনা করলেও ভবিষ্যত নিয়ে খুবই চিন্তিত। পড়াশুনা শেষ হলে তার কি চাকুরি হবে! নানা চিন্তায় কপালে ভাঁজ পড়ে আমাদের। তারপরেও লিতুনকে উৎসাহ দেই আমরা। তাকে বলি পড়াশুনা করলে, যোগ্যতা অর্জন করলে একদিন কিছু না কিছু হবেই। এসবের মধ্যে এখন দুই সন্তানের মধ্যে লিতুন জিরাকে নিয়ে অনেক স্বপ্ন দেখি বলে জানান লিতুন জিরার সংগ্রামে সব সময় ফুয়েল হিসেবে থাকা জাহানারা বেগম।

জন্ম থেকেই লিতুন জিরার দুটি পা নেই। দুই হাতও নেই কনুইয়ের ওপর থেকে। তবু লেখাপড়ার অদম্য চেষ্টা মেয়েটির। লেখার জন্য ডান হাতের বাহুর আগা দিয়ে কলম চেপে ধরে চোয়ালে। এভাবে লিখেই কৃর্তিত্বের সাথে প্রাথমিকের গন্ডি পেরিয়ে পড়াশুনা করছে মাধ্যমিকে। এবার সে উপজেলার গোপালপর স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে জেএসসি পরীক্ষায় অংশ নেবে।

এরআগে, ২০২০ সালের খানপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে জিপিএ-৫ পাওয়ার সাথে বৃত্তি পায় লিতুন জিরা। লিতুন জিরা শুধু পড়াশুনাতে কৃর্তিত্ব অর্জন করেছে তা কিন্তু না! পড়াশুনার পাশাপাশি সে টানা দ্বিতীয়বারের মতো রচনা প্রতিযোগিতায় জেলা পর্যায় পুরস্কার লাভ করেছে। এছাড়াও আবৃত্তি, চিত্রাংকন প্রতিযোগিতায় নিজের পারদর্শিতা দেখানোর পাশাপাশি খুলনা বেতারেও নিয়মিত গান ও কবিতা আবৃত্তির করে যাচ্ছে সে।

জাগো/এমআই

আরো পড়ুন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

সর্বশেষ