সেতুর অভাবে ঘুরতে হয় ১২ কিলো রাস্তা

আরো পড়ুন

নিজস্ব প্রতিবেদক 
যশোর সদর উপজেলার কচুয়া ইউনিয়নের মধ্যেভাগে প্রবাহিত হয়েছে ভৈরব নদের শাখা নদী বুড়িভৈরব নদ। নদের পূর্বপাশে ইউনিয়নের ৬টি গ্রাম আর পশ্চিমে ইউনিয়নের ৮টি গ্রাম। এরমধ্যে ইউনিয়নের ১০টি গ্রামের প্রায় আনুমানিক ২০ হাজার যাতায়াতে আজও একমাত্র ভরসা হচ্ছে নদের ওপর তৈরি ঝুঁকিপূর্ণ একটি বাঁশের সাঁকো দিয়ে। চরম ভোগান্তিতে পড়ে দুই পাড়ের স্কুল পড়ুয়া ছেলেমেয়েরা। বিশেষ করে কৃষিপণ্য আনা-নেওয়া, অন্যান্য মালামাল বহনে ভোগান্তির শেষ নেই। দুই শ’ ফুট সেতুর অভাবে প্রতিনিয়তই কৃষিপণ্য পরিবহণে স্থানীয়দের ঘুরে যেতে হয় ১২ কিলোমিটার বাড়তি পথ। এর পরও নদের ওপর একটি পাকা সেতু তৈরি হচ্ছে না। বছরের পর বছর একটি সেতুর অপেক্ষায় দুই পাড়ের বাসিন্দারা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, কয়েক যুগ ধরে শুধু প্রতিশ্রুতিই দিয়ে যাচ্ছেন জনপ্রতিনিধিরা। এ অবস্থায় নড়বড়ে বাঁশের সাঁকোয় পারাপার হতে গিয়ে প্রায়শই ঘটছে ছোট-বড় দুর্ঘটনা।
এলাকার কয়েকজন বাসিন্দার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বুড়িভৈরব নদের ওপর স্থানীয় জনগণ নিজ উদ্যোগে প্রায় দুই দশক আগে একটি বাঁশের সাঁকো তৈরি করেন, যা দুই বছর পর পর নতুন করে নির্মাণ করতে হয়। সাঁকোটি তারা নিজেদের উদ্যোগে সংস্কারও করছেন। ওই শাখা নদের পূর্বপাশে কচুয়া ইউনিয়নের মুনসেফপুর, মথুরাপুর, ভাগু, দিয়াপাড়া, ভগবতিলতা, ঘোপ, নরসিংহকাটি, নিমতলী। আর পশ্চিমে রায়মানিক, কচুয়া, আবাদ কচুয়া, পুড়া কচুয়া, সাতঘরিয়া। এই ইউনিয়নের ১৪টি গ্রামের মধ্যে ১০ টি গ্রামের প্রায় ২০ হাজার মানুষ ওই সাঁকোটি ব্যবহার করেন। তাদের প্রতিদিন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা শহর ও হাটবাজারে কাজের জন্য সাঁকোটি পার হতে হয়।
সরেজমিনে দেখা গেছে, সাঁকোটির অবস্থা খুব একটা সুবিধার নয়। বাঁশের তৈরি সাঁকোটি নড়বড়ে হয়ে পড়েছে। নদের পশ্চিম পাশে দুটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থাকাতে পূর্ব পাশের গ্রামের ছেলে-মেয়েরা ঝুঁকি নিয়ে যাওয়া আসা করছেন। সাঁকোটি পার হওয়ার সময় পায়ে হেঁটেই যাচ্ছেন। শিক্ষার্থীরাও পায়ে হেঁটে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাচ্ছেন। সাবধানে চলাচল করছেন সবাই। কারণ, সাঁকোর ওপর থেকে অনেকে পড়ে আহত হয়েছেন। একটু অন্যমনস্ক হলে যেকোনো সময় পড়ে যাওয়ার শঙ্কা রয়েছে। এছাড়া মুনসেফপুর নদের গা ঘেসে একটি মন্দির রয়েছে। সারাদিনই পূজাঅর্চনা করতে দুই পাড়ের বাসিন্দাদের করতে হয় যাতায়াত।
দুইপাড়ের মানুষের দুর্ভোগের ঘটনা বর্ণনা করে মুনসেফপুর এলাকার বৃদ্ধ বাসিন্দা অশোক কুমার দত্ত বলেন, ‘আমাগো দুঃখকষ্টের কথা কেউ শোনে না। বর্ষার সময় সাঁকোটি পার হওয়া অনেক কষ্টের। গাঙ্ক (নদী) ভরা পানি থাকে। তখন সাঁকোটি নড়বড়ে হয়ে যায়। আমগরে কষ্ট কেউ বুঝে না। বহু বছর ধরে শুনি, এখানে সেতু হবে। এমপি-চেয়ারম্যানরা কতবার এসেছে কিন্তু কখনো আর সেতু হলো না। আর হবে কি না, সেটাও জানি না।’ শুভরঞ্জন দত্ত নামে এক জেলে বলেন, ‘বছরের পর বছর ধরে এতগুলো গ্রামের মানুষ এই বাঁশের সাঁকো দিয়ে চলাচল করে আসছেন। রাতের বেলায় টর্চ দিয়া পা টিপে টিপে চলাচল করতে হয়। সেখানে প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটে। সুদীপ্ত দত্ত নামে এক অষ্টম শ্রেণীর এক শিক্ষার্থী জানান, নদের পাশেই একটা হাই স্কুল রয়েছে; সাঁকো পার হয়ে যাওয়া লাগে বলে; মা বাবা ঐ স্কুলে ভর্তি করেনি। ১৫ কিলো দূরে রুপদিয়াতে একটা স্কুলে ভর্তি হয়েছি।
সুকুমার নামে পঞ্চম শ্রেণীতে পড়ুয়া এক শিক্ষার্থী বলেন, ‘অনেক ভয় নিয়ে এই সাঁকো পার হতে হয়। অনেকেই এই ভয়ের কারণে অনেক দূরের স্কুলে ভর্তি করেছে। কচুয়া গ্রামের বাবুল হোসেন বলেন, ‘গ্রামগুলো কৃষিনির্ভর। নানা রকমের কৃষিপণ্য উৎপাদন হয়। কিন্তু যোগাযোগব্যবস্থার কারণে কৃষিপণ্যের সঠিক দাম পাওয়া যায় না। একটি সেতুর কারণে ওই সব গ্রামে তেমন কোন উন্নয়নও হয়নি। গ্রামগুলো এখনো অবহেলিত। কোনোরকমে যাতায়াতের জন্যে এলাকাবাসী বাধ্য হয়ে বাঁশের দীর্ঘ সাঁকো তৈরি করে নিয়েছেন।’ তিনি বলেন, নদীর ওপারে আমাদের অনেক জমি আছে, চাষাবাদের উৎপাদিত ফসল আনতে হলে পাশ্ববর্ত্তী ইউনিয়ন নরেন্দ্রপুর ইউনিয়নের ১২ কিলোমিটার ঘুরে আসতে হয়। এতে সময় এবং পরিবহন ব্যয় দুটি বেড়ে যায়।
দেলোয়ার হোসেন আরেক কৃষক বলেন, ‘অনেক বছর ধরে আমাদের বাঁশের সাঁকো তৈরি করে যাতায়াত করতে হচ্ছে। কেউ আমাদের রাস্তা এবং একটি সেতু নির্মাণ করে দিচ্ছে না। আমরা কি এই দেশের নাগরিক না? আমরা তো সরকার বা চেয়ারম্যান-মেম্বারদের ভোট দিই। তাঁরা কেন আমাদের দিকে তাকায় না। আমরা বছরের পর বছর দুর্ভোগ নিয়ে চলাচল করছি। আমাদের দুর্ভোগ লাগবে এখানে একটি সেতু নির্মাণের দাবি জানাচ্ছি।’
স্থানীয় কচুয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান লুৎফর রহমান ধাবক বলেন, বাঁশের সাঁকোর ওপর স্থায়ী সেতু নির্মাণের জন্য জেলা পরিষদ ও স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) বরাবর বহু আবেদন নিবেদন করা হয়েছে। কিন্তু কোনো সাড়া মিলছে না। নদের দুই পাড়ের অন্তত ২০ হাজার মানুষ সাঁকো নিয়ে সমস্যায় আছে। তথ্যপ্রযুক্তির এই ডিজিটাল যুগেও এখানকার মানুষ বাঁশের সাঁকোর ওপর নির্ভরশীল, এটা ভাবতে কষ্ট হচ্ছে। ঐ স্থানে সাঁকোর বিকল্প একটি পাকা সেতু নিমাণ অপরিহার্য হয়ে পড়েছে।
স্থানীয় সরকার বিভাগের (এলজিইডি) যশোরের নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ শরিফুল ইসলাম বলেন, ‘ওই স্থানে সেতু নির্মাণের বিষয়টি আমাদের তালিকায় নেই। উপজেলার আবেদনের পেক্ষিতে বিষয়টি বিবেচনা করা হবে। স্থানীয়রা জানান, সাঁকো পারাপার হতে গিয়ে প্রতিনিয়ত ঘটছে ছোট বড়-দুর্ঘটনা। কয়েক যুগের বেশি সময় ধরে স্থানীয়রা এখানে একটি সেতু নির্মাণের দাবি জানালেও তা বাস্তবায়ন হয়নি। শুধু প্রতিশ্রæতি দিয়েই বছরের পর বছর পার করে দিচ্ছেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা। এদিকে শুধু আশ্বাস নয় জনদুর্ভোগ কমাতে নদের উপর সেতু নির্মাণে দ্রæত উদ্যোগ নিবে প্রশাসন এমন প্রত্যাশা ভুক্তভোগীদের।
জেবি/জেএইচ 

আরো পড়ুন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

সর্বশেষ