মমতাজের নৌকাডুবির নেপথ্যে

আরো পড়ুন

এবারের নির্বাচনে আলোচিত প্রার্থীর পরাজয়ের ঘটনা রয়েছে অনেক। এর মধ্যে অন্যতম মানিকগঞ্জ-২ আসনে সংগীতশিল্পী মমতাজ বেগমের পরাজয়। নৌকা প্রতীক নিয়ে সরকার দলীয় এই প্রার্থী স্বতন্ত্র প্রার্থী ও জেলা আওয়ামী লীগের কোষাধ্যক্ষ দেওয়ান জাহিদ আহমেদ টুলুর ট্রাক প্রতীকের কাছে ধরাশায়ী হয়েছেন।

তিনবারের এমপি, জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পী মমতাজের কুপোকাতের নেপথ্যে উঠে এসেছে নানান কারণ। পরাজয়ের অন্যতম কারণ হিসেবে দলীয় নেতাকর্মীরা মনে করছেন, দলের ত্যাগী নেতাকর্মীদের সম্পর্কে মমতাজের লাগামহীন অশালীন বক্তব্য। সিংগাইরে নৌকা প্রতীকের নির্বাচিত ইউপি চেয়ারম্যানদের অবমূল্যায়ন ও অসম্মান করা, জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি ও জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান বীর মুক্তিযোদ্ধা গোলাম মহিউদ্দিনকে কটাক্ষ করে বক্তব্য দেওয়া ছিল তার পরাজয়ের অন্যতম নিয়ামক।

এ ছাড়া মমতাজের তৃতীয় স্বামী থাকলেও তালাকপ্রাপ্ত দ্বিতীয় স্বামী মানিকগঞ্জ পৌরসভার মেয়র রমজান আলীকে বিভিন্ন নির্বাচনি সভায় নেওয়ায় সহজভাবে নেননি সাধারণ ভোটার- এমনটি মনে করেন জেলা আওয়ামী লীগের এক নেতা। মমতাজ তার নির্বাচনি প্রতিটি বক্তৃতায় অনেক ত্যাগী নেতা ও তার প্রতিদ্বন্দ্বী দেওয়ান জাহিদ আহমেদ টুলুকে ‘বা…’ আওয়ামী লীগ উপাধি দেন। যা নিয়ে নেতাকর্মীদের মধ্যে দারুণ ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। এর কারণে নৌকা ডুবেছে।

অনেক নেতাকর্মীর নাম পদবী ধরে ধরে তারা টাকার কাছে ট্রাক প্রতীকের প্রার্থীর কাছে বিক্রিসহ নানান মন্তব্যে নাখোশ হয়েছেন দলীয় নেতাকর্মীসহ সাধারণ ভোটারও। যে কারণে মমতাজের নিজ উপজেলায় শোচনীয় পরাজয় ঘটে।

সিংগাইরে নৌকার এই প্রার্থী ভোট পান ৩৯ হাজার ৭৮৪। পক্ষান্তরে দেওয়ান জাহিদ আহমেদ টুলু ট্রাক প্রতীক নিয়ে পান ৬০ হাজার ৫৩৮। সিংগাইরে ২০ হাজারে ৭৫৪ ভোট কম পান মমতাজ বেগম। এর পেছনে বড় নিয়ামক কাজ করেছে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও মেম্বাররা। মমতাজ এমপি নির্বাচিত হওয়ার পর তার প্রথম পক্ষের স্বামীর ভাগ্নে উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শহিদুর রহমানের ইন্ধনে ওই সব চেয়ারম্যান ও মেম্বারদের নিয়ে নানান অপবাদ দিয়ে তাদের মন বিষিয়ে তোলেন। যে কারণে জনপ্রতিনিধিরা নৌকা ত্যাগ করে মানসম্মান নিয়ে ট্রাকে চেপে বসায় নৌকার ভরাডুবি হয়েছে।

হরিরামপুর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও জেলা আওয়ামী লীগের ত্রাণ ও সমাজ কল্যাণ সম্পাদক দেওয়ান সাইদুর রহমান বলেন, এমপি মমতাজ দলীয় রাজনীতি কুক্ষিগত করে অরাজনীতিকদের তার অনুসারী করেছেন। সেই সঙ্গে কতিপয় জনবিচ্ছিন্ন নেতাকর্মীদের কাছে টেনে ত্যাগী নেতাদের মমতাজ সাধারণ নেতাকর্মীদের কাছ থেকে দূরে সরে গেছেন।

তিনি জানান, তার নামেও মমতাজের অনুসারীরা মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি করতেও পিছপা হয়নি। এ ছাড়া এমপির বিশেষ বরাদ্দসহ টিআর কাবিখা, কাবিটা নামে-বেনামে লোপাট, বিতর্কিত ব্যক্তিদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দেওয়া এবং দীর্ঘ ১৫ বছরে কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন না করা অন্যতম কারণ।

এই নেতা আরও জানান, তার বর্তমান স্বামী থাকার পরও তালাকপ্রাপ্ত দ্বিতীয় স্বামী রমজান আলীকে সঙ্গে নিয়ে একমঞ্চে বসে নির্বাচনি সভা-সমাবেশ করেছেন। সাধারণ ভোটাররা ভালোভাবে নেননি এটি। সেইসঙ্গে তার পারিবারিক ও ব্যক্তিগত দ্বন্দ্বও ভোটে রদের মধ্যে প্রভাব ফেলে। নিজের বাহিনী দিয়ে তৃতীয় স্বামী স্বামী ডা. মঈন হাসানের ওপর হামলা করেছেন। এ ছাড়া তার প্রয়াত বাবা মধু বয়াতির প্রথম স্ত্রী ও তিন কন্যার প্রতি অবিচারের ঘটনায় মমতাজকে পড়তে হয় বেকায়দায়সহ নানান সমালোচনায়। তিন বোনসহ কাছের অনেক আত্মীয় মমতাজের পক্ষ ত্যাগ করে স্বতন্ত্র প্রার্থী টুলুকে সমর্থন দেন।

এবারের নির্বাচনে এই আসনের সিংগাইর, হরিরামপুর ও সদরের একাংশের ১৯৩টি ভোটকেন্দ্রে ট্রাক প্রতীকের স্বতন্ত্র প্রার্থী দেওয়ান জাহিদ আহমেদ টুলু পেয়েছেন ৮৪ হাজার ৫২৫ ভোট। নৌকা প্রতীক নিয়ে মমতাজ বেগম পেয়েছেন ৭৮ হাজার ২৬৯ ভোট।

প্রসঙ্গত, ২০০৮ সালে সংরক্ষিত মহিলা আসনে এমপি হন মমতাজ। ২০১৪ সালে মানিকগঞ্জ-২ আসন থেকে নৌকা প্রতীকে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ও ২০১৮ সালে নৌকা প্রতীক নিয়ে এমপি হন তিনি। ২০২৪ সালের নির্বাচনে নৌকা প্রতীক পেয়েও অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনে মমতাজের পরাজয় ঘটে।

জাগো/জেএইচ

আরো পড়ুন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

সর্বশেষ