ভোটাধিকার বঞ্চনায় যশোরের লক্ষাধিক প্রবাসী ভোটার

আরো পড়ুন

নিজস্ব প্রতিবেদক
অজ্ঞতা, অসচেতনতা আর রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ হীনতায় এবারও ভোটাধিকার বঞ্চিত হচ্ছেন যশোরের লক্ষাধিক প্রবাসী ভোটার। বর্হিবিশ্বের কোনো দেশ থেকে পোষ্টাল ব্যালোটে ভোট দিতে আগ্রহ দেখাননি জেলার প্রবাসী ভোটারা। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কোনো আবেদনও জমা পড়েনি জেলা রিটার্নি কর্মকর্তার দপ্তরে। কিন্তু ভোট দিতে না পারার কারণে ক্ষোভ-হতাশার সাথে বঞ্চনার অভিযোগ তুলেছেন প্রবাসী ভোটারসহ দেশে থাকা তাদের আত্মীয় পরিজনরা।

বিষয়টি নিয়ে সরেজমিনে জেলার বিাভিন্ন এলাকা ঘুরে হরেক তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে জেলার ঝিকরগাছা-বাঁকড়া এলাকার বাড়িতে বাড়িতে রয়েছে প্রবাস থেকে রেমিটেন্স পাঠানোর বার্তা। এ এলাকার নওয়ালী বাজারের সড়ক ধরে এগুতেই যে কারো নজর কাড়ে রাাস্তার কোলঘেসে সানবাঁধানো পুকুর। অপর পাশে দৃষ্টিনন্দন আধুনিক স্থপত্য শৈলীর দোতলা বাড়ি। চাকচিক্যময় টাইলসের কারুকাজ খচিত বাড়িটি এলাকার জনমনে রেমিটেন্সের বার্তা ছড়ায়। সুনশান নিরবতায় এ বাড়িতে স্বস্ত্রীক থাকেন বয়োবৃদ্ধ আবুল হোসেন। তাদের সন্তান আলতাফ হোসেন তিন দশক বেশি সময় পরিবার নিয়ে থাকেন ফ্রান্সে। স্ত্রী ও এক সন্তানসহ তিনজনই ঝিকোরগাছার ভোটার। কিন্ত প্রবাস জীবনে কখনও নিজ দেশের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেননি।

একই গ্রামের মুকুল হোসেনও আড়াই দশক ধরে মালয়েশিয়াতে। তার ছোটভাই লিটন হোসেন থাকেন অস্ট্রেলিয়ায়। মুকুল-লিটনও দেশের কোনো নির্বাচনে অংশ নিতে না পারার আক্ষেপ করেন। মুঠোফোনে মুকুল হোসেন বলেন, ‘প্রবাসে থেকে পরিশ্রমের টাকায় দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখলেও আমরা ভোটে অংশ নিতে পারি না। যা আমাদের জন্য দুঃখজনক।’ আলতাফ-মুকুল-লিটন না এই গ্রামের তিন শতাধিক মানুষ প্রাবাসী। তারা সবাই ভোটাধিকার বঞ্চিত।

যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলার বাঁকড়া ইউয়িনের বড়খড়শি গ্রামের ইমদামুল হক। প্রবাসী এই ভোটার একযুগ ধরে চাকরি করেন মালেশিয়ার জোহর রাজ্যের কোতা তিঙ্গি জেলার পেঙ্গারাংয়ে একটি প্রতিষ্ঠানে। ইমোতে কথা বলার সময় তিনি বলেন, ‘দীর্ঘদিন ভোট দেয়নি। ভোট দেওয়ার আগ্রহ রয়েছে। তবে পোস্টাল ব্যালট সম্পর্কে জানি না। দূতাবাসগুলো যদি সহযোগিতা করে তাহলে তো ভোট দিতে চাই।’
মণিরামপুর উপজেলার কাশিমপুর গ্রামের ইয়ানুর রহমান হোটসআ্যাপে এ প্রতিবেদকের সঙ্গে আলাপকালে বলেন, ‘৭ বছর ধরে কাতারে রয়েছি। এরই মধ্যে হয়ে গেছে জাতীয় ও স্থানীয় একাধিক নির্বাচন। দেশে থাকাকালে প্রতিটি নির্বাচনে ভোট দিয়েছি, প্রবাসে থেকেও নির্বাচন এলে ভোট দেওয়ার জন্য ছটফট করি। কিন্তু খরচের ভয়ে যাওয়া হয় না। প্রসঙ্গত তিনি বলেন ‘পোস্টাল ভোট কি, কিভাবে আবেদন করতে হয়, কোথায় আবেদন করতে হয়-কি ছুই জানিনা।’ ক্ষোভ প্রকাশ করে এ প্রবাসী বাংলাদেশী বলেন, ‘দূতাবাসগুলো কিভাবে রেমিট্যান্স বৃদ্ধি করা যায়, সেটা নিয়ে আমাদের নিয়ে সেমিনার-সভা করে। কিন্তু ভোট আমার অধিকার, সেটা কিভাবে দেবো সেটা নিয়ে তাদেও কোনো আগ্রহ বা উদ্যোগ নেই।’

নিকটাত্মীর টেলিফোনের মাধ্যমে অস্টোলিয়া প্রবাসী মনিরুজ্জামান টিটো বলেন,‘ আমরা প্রবাসীরা রেমিট্যান্স পাঠিয়ে জিডিপির ৬ শতাংশ পূরণ করি, অথচ দেশে জনপ্রতিনিধি নির্বাচনে প্রবাসীদের ভোট দেওয়ার সহজ কোন পদ্ধতি নেই। নির্বাচন কমিশন পোস্টাল ভোট পদ্ধতি চালু করলেও প্রচার প্রচারনার অভাবে এ সুবিধা সম্পর্কে অধিকাংশ প্রবাসী এখনও জানে না।’ তিনি বিভিন্ন দেশে থাকা বাংলাদেশী অধ্যুষিত এলাকা এবং বাংলাদেশী কমিউনিটিতে দূতাবাসের মাধ্যমে পোস্টাল ভোট সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে ক্যাম্পেইন করা এবং এ ব্যবস্থা আরো সহজ করার দাবি জানিয়েছেন।

বাঁকড়া ইউয়িনের চেয়ারম্যান আনিস-উর- রহমান বলেন, ‘আমার ইউনিয়নে ১৪ হাজার ভোটার রয়েছে। এমন কোন বাড়ি নেই যে দু-একজন বিদেশ নেই। ইউপি পরিষদের এক পরিসংখ্যানমতে প্রায় আড়াই হাজার ভোটার রয়েছে যারা বিভিন্ন দেশে অবস্থান করছে। তারা দেশের উন্নয়নে অনেক ভ‚মিকা রাখছে। দেশে সরকার গঠন বা স্থানীয় নির্বাচনে মতামত প্রদানে তাদের গুরুত্ব রয়েছে। তবে তারা ভোট দিতে পারছে না। সরকার এই বিষয়ে প্রদক্ষেপ নেওয়ার আহŸান জানান তিনি।

স্থানীয় নির্বাসখোলা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান খায়রুজ্জামান বলেন, ‘আমার ইউনিয়নে সহ্রাধিক ভোটার বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কাজ করেন। তাদের উপার্জিত অর্থে নিজ নিজ এলাকার জীবন-মান পরিবর্তন হয়েছে। তাদের পাঠানো রেমিটেন্সে দেশেসহ এলাকায় উন্নয়ন হচ্ছে। তবে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগে নির্বাচন কমিশনের তেমন একটা উদ্যোগ নেই। পাশাপাশি প্রচার-প্রচারণার ঘাটতিও রয়েছে বলে মনে করেন তিনি।
জেলা কর্মসংস্থান ও জনশক্তি কার্যালয় জানিয়েছে, গত এক যুগে যশোর থেকে বৈধভাবে ১লাখ ১০ হাজার ২৯৮ জন কাজের উদ্দেশ্য বিদেশ গিয়েছেন। তারা সকলেই যশোরে ৯৩টি ই্উনিয়নের নিজ নিজ এলাকার ভোটার।

জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয় সংশ্লিস্টরা জানিয়েছেন,‘গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ ২০০৮ এর সংশোধনী অনুযায়ী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিদেশে বসবাসরত বাংলাদেশি নাগরিকদের ডাকযোগে পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে তাদের নিজ নিজ নির্বাচনী এলাকায় ভোটাধিকার প্রয়োগের বিধান রয়েছে। নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার ১৫ দিনের মধ্যে ভোটদানে আগ্রহী প্রবাসীদের নিজনিজ এলাকার রিটার্নিং কর্তকর্তার কাছে পোস্টাল ব্যালটের আবেদন করতে হবে। আর তার প্রেক্ষিতে সুনির্দিষ্ট নিদের্শনা মেনে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারবেন।

এই বিষয়ে জেলা সিনিয়র নির্বাচন অফিসার আনিচুর রহমান বলেন, ‘নির্বাচন কমিশনের নিয়ম অনুযায়ী প্রবাসে থাকা কোনও ভোটার ভোট দিতে চাইলে পোস্টাল ভোটের মাধ্যমে তিনি তার ভোট দিতে পারবেন। সেক্ষেত্রে তাকে নিজ জেলার রিটার্নিং অফিসারের কাছে ডাকযোগে পোস্টাল ব্যালটের জন্য নির্বাচনের তফশিল ঘোষণার ১৫ দিনের মধ্যে আবেদন করতে হয়। পোষ্টাল ব্যোলটের জন্য ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত আবেদনের সময়সীমা থাকলেও জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তা বা উপজেলা কর্মকর্তার কাছে কোনো আবেদন জমা পড়েনি। যশোরে এবার পোস্টাল ব্যালটের জন্য কেউ আবেদন করেনি। তুন করে আবেদনের সময়ও আর নেই।

জেলার রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, দেশের অন্যান্য জেলারমত যশোরেও নির্বাচনী প্রচার প্রচারণা চলছে জোরেসোরে। নির্বাচনী জোয়ারের ঢেউ লেগেছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে থাকা জেলার প্রবাসী ভোটারদের মধ্যে। দেশের চলমান রাজনীতি, অর্থনীতি ও উন্নয়ন প্রশ্নে অন্তহীন কৌতুহলের পাশপাশি এবারের নির্বাচনে অংশ নেওয়া দল, প্রার্থী, পরিবেশ নিয়েও সব খবরা খবর রাখছেন তারা। এবারের ভোট উৎসবে ভোট দেওয়ার ইচ্ছা থাকলেও অজ্ঞতা আর অনভিজ্ঞতার কারণে এ জেলার প্রবাসীরা ভোট দিতে পারছেন না। পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে ভোট দেওয়ার সুযোগের বিষয়টিই জানেন না অধিকাংশ প্রবাসী। আর এ অবস্থার জন্য সরকারী উদ্যোগহীনতার সঙ্গে সঙ্গে বিদেশে বাংলাদেশের দূতাবসগুলোর অসহযোগিতাকেও দায়ি করা হয়েছে।

জেবি/জেএইচ 

 

 

আরো পড়ুন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

সর্বশেষ